চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে বাসায় বসে দিন দিন অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছি, বিষন্ন হয়ে যাচ্ছি। আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা এমন একটা ভাব নিয়ে সামাজিক জীবন থেকেও নিজেকে দিন দিন আইসোলেটেড করে ফেলছি। সামাজিক জীবন বলতে স্কুলের বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে আড্ডা। সেখানেও যেন কোন প্রাণ নেই। বন্ধুমহলের আড্ডার প্রধান বিষয় ভিডিও গেম পাবজি। সেখানে বলার মত আমার কিছুই নেই। শুধু বসে বসে শুনে যাই। সামনের দীর্ঘপথের অপেক্ষার সময়গুলো কাটাতে কিছুদিন আগে আমিও খেলা শুরু করি। আর কিছু না হোক আড্ডায় সামিল হওয়ার সাথে কিছুটা সময়ও তো অতিবাহিত হবে।


খুব আহামরি কিছু না। একটি অনলাইন গেম যেখানে ১০০ জন খেলোয়াড়কে একটা দ্বীপে নামিয়ে দেয়া হবে। সবাই মিলে নিজেদের সাথে মারামারি করে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকবে সে-ই জয়ী হবে। সাধারণ আইডিয়া এবং অসাধারণ জনপ্রিয়তা। তো প্রথম দিকে যখন খেলা শুরু করলাম কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছি না। আমি ছাড়া বাকি ৯৯ জনের কেউ না কেউ এসে ঠিকই মেরে দিয়ে চলে যায়। নিজে কখনো একজনকে মারতে পারি, কখনও পারি না। ফলে যা হওয়ার হলো। আগে আগে মরে যাওয়ায় বন্ধুদের উপহাস। শেষ পর্যন্ত এক বুদ্ধি বের করলাম। খেলার শুরু থেকে লুকিয়ে খেলা শুরু করলাম। সবাই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে মরে যেত আর আমি লুকিয়ে থাকতাম। বুদ্ধিটা ভালোই কাজে দিলো। আগে যেখানে ৯০-৯৫ তম হতাম সেখান এখন ৫-১০তম হচ্ছি। কিন্তু ১ম হতে পারছি না কখনোই।


এবারে মূল ঘটনায় আসি। আমি উপরের দিকে আসার জন্য যে পন্থা অবলম্বন করেছিলাম সেটা ছিলো একটা শর্টকাট বা হ্রস্বতর পথ। যেখানে হেরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমি তো খেলতেই পারি না। লুকিয়ে তো আর শেষ পর্যন্ত যেতে পারবো না। একসময় বাস্তব যুদ্ধে অবতীর্ণ তো হতেই হবে। বরং এখন আমার সাথে যারা যুদ্ধ করছে তারা অনেক ভালো খেলোয়াড়, বাকি ৭০-৮০ জনকে হারিয়েই তারা এই অবস্থানে এসেছে। পক্ষান্তরে আমি যেটা করেছি সেটা নিম্নমানের কৌশল। আমি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিনি। বাস্তবতা থেকে লুকিয়ে থেকেছি। এরচেয়ে আমি যদি প্রথম থেকেই সম্মুখ যুদ্ধে খেলতাম তবে আমার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হতো। তার চেয়ে একটু কঠিন শত্রুকে মোকাবেলা করতে পারতাম। এটাই পাবজি গেম থেকে পাওয়া আমার একমাত্র শিক্ষা।


আমাদের বাস্তব জগৎটাও ঠিক এমনই। ছোটবেলা থেকেই সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে গণ্য করতে হয়, সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আজ যদি ছোট সমস্যাগুরোকে আপনি এড়িয়ে যান কাল তার থেকে বড় সমস্যাগুলোকে আপনি কখনোই মোকাবেলা করতে পারবেন না। কারণ জীবনে চলার পথে সমস্যা কখনও শেষ হয় না। শক্তির নিত্যতা সূত্রের মত এটি শুধু এক রূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তিত হয়, অথবা বড় আকার ধারণ করে। এই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই সুখ আসে, আসে অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিখ্যাত পর্বতারোহী এড ভিয়েশ্চার্স তার অটোবায়োগ্রাফি ‘নো শর্টকাট টু দ্য টপ’ বইতে দেখিয়েছেন কিভাবে তিনি বার বার ব্যর্থ হয়েও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। চূঁড়ায় পৌঁছানোর জন্য তিনি কোন শর্টকাট পদ্ধতি অবলম্বন করেননি। তিনি ছোট ছোট সমস্যাগুলোকে সমাধান করে হাত পাকিয়েছেন। সমাধানে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার চেষ্টা করেছেন।


মানুষের জীবনই হলো অসীমসংখ্যক সমস্যার একটি অসীমধারা। জীবন মাত্রই সমস্যা, আর সেগুলো ‘সমাধান’-এর পথ খুঁজে বের করা। এখানে মূখ্য শব্দ একটাই -‘সমাধান’। যদি আপনি আপনার সামস্যাগুলোকে এড়িয়ে যান কিংবা মনে করেন আপনার জীবনে কোন সমস্যাই নেই তাহলে আপনি ভবিষ্যত অন্ধকার। অনুরূপভাবে আপনি যদি এও মনে করেন যে আপনার সমস্যা আছে কিন্তু আপনি সমাধান করতে পারছেন না সেক্ষেত্রেও আপনার জীবন অন্ধকার। এর থেকে বের হয়ে আসার একটাই মূলমত্র -‘সমাধান’। জীবনে সুখী হতে গেলে আমাদের সবসময়েই কিছু না কিছু সমাধান করতে হয়।


মার্জ সর্ট নামে একটি সর্টিং অ্যালগোরিদম আছে। যেখানে পুরো সমস্যাটাকে ভেঙে একক অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়। এরপর একক সংখ্যক সমস্যার সমাধান আলাদাভাবে করতে হয়। অতঃপর সমাধান করা একক সমস্যাগুলোকে একত্র করলেই দেখা যায় বড় সমস্যাটির সমাধান হয়ে গিয়েছে। আপনার সমস্যাগুলোকে প্রথমেই বড় করে দেখতে গেলে আপনি শুধুমাত্র হতাশই হবেন। কিন্তু বড় সমস্যাটিকে ভেঙে ছোট ছোট করে একটা একটা সমাধান করতে শুরু করুন। দেখবেন একসময় পুরো বিশাল বড় সমস্যাটার সমাধান হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই কেন? গোটা বিজ্ঞানই চেষ্টা করছে সবকিছুকে ভেঙে ছোট করে সমাধান করার। যেমন রসায়নে অনু ভেঙে পরমানু, সেখান থেকে নিউক্লিয়াস, প্রোটন ইলেকট্রন, আবার প্রোটনকে ভেঙে কোয়ার্ক। বিজ্ঞানীরা যত পারছেন ভাঙছেন, ভেঙে ছোট করছেন। কেন? কারন বড় জিনিসকে জানার থেকে ছোট জিনিসকে জানা সহজ, ছোট সমস্যাকে সমাধান করা সহজ।


আমি অসাধারণ কেউ না। সমাজের চোখে সফল কোন ব্যাক্তিও না। বরং আমি ব্যর্থ। পুরো জীবনটাই ব্যর্থতা দিয়ে ভরা। তাই হয়ত আমার এসব কথার কোন মূল্য না ই থাকতে পারে। কিন্তু আমি শিখছি, প্রতিনিয়ত শিখছি প্রতিটি ব্যর্থতা দিয়ে। জগতের কোন মানুষই ব্যর্থ মানুষের কথা শুনতে চায় না। সফল মানুষের কথা শুনেই সফল হতে চায়। এটাও শর্টকাটে প্রতিষ্ঠিত হবার একটা উপায়ই মাত্র। কিন্তু খুঁজে দেখুন প্রতিটি সফল মানুষের পিছনে কত শত ব্যর্থ গল্প রয়েছে। সেসব গল্প অজানাই থেকে যায়।


- মার্চ ২০১৯