হিমালয়! নামই যার সমস্ত গাম্ভীর্য ধারণ করে আছে, পৃথিবীর সকল উচ্চতম পর্বতগুলোই যে পর্বতমালার অন্তর্গত, সমস্ত আধ্যাত্মিক চেতনাকে হাজার হাজার বছর ধরে কেন্দ্রীভূত করে আসছে যে গিরিশ্রেণী, নিজের রূপ-সূধায় মুগ্ধ করে, আরোহনের প্রলোভন দেখিয়ে হাজারো পর্বতারোহীর জীবন কেড়ে নিয়েছে যে পর্বতমালা, পৃথিবীর তৃতীয় মেরু নামে পরিচিত সেই হিমালয়ের জন্মলগ্ন আজ থেকে প্রায় ছয় কোটি বছর আগে।


পৃথিবীর ভূত্বক অনেকগুলো ভেসে বেড়ানো প্লেটের সমষ্টি। রোমান সৃষ্টির দেবতা টেকটোনিক-এর নামানুসারে এই প্লেটগুলোকে বলা হয় টেকটোনিক প্লেট। ভেসে থাকার কারণে এই প্লেটগুলো এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায় সরে যেতে পারে। এই সরে যাওয়ার প্রবৃত্তিকে বলা হয় টেকটোনিক মুভমেন্ট। টেকটোনিক মুভমেন্টের কারণে ভারত মহাদেশ ও এর আশেপাশের দেশগুলো যে প্লেটের উপর অবস্থিত সেই ইন্ডিয়ান প্লেট দক্ষিন থেকে এসে উত্তরের ইউরেশিয়ান প্লেটের উপর চাপ সৃষ্টি করে। এই দুইটি প্লেটের সংঘর্ষের আগে তাদের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল টেথিস সাগর। সেই সাগরের তলদেশে জমে থাকা পলি দুই প্লেটের সংঘর্ষের ফলে উপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করে এবং শক্ত শিলাখন্ডে পরিণত হয়ে সৃষ্টি করে আমাদের আজকের পরিচিত হিমালয়ের।


প্রাচীন যুগ থেকে দেড় হাজার মাইল বিস্তৃত এই পর্বত শ্রেণীকে মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বরের আবাসন, দেবভূমি। তার বর্ণনা রয়েছে পুরাণ ও বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে। এই পর্বতমালার শত শত গুহাজুড়ে যুগে যুগে কত সাধক যে আধ্যাত্মিক অভীষ্ট সাধনে ব্রতী হয়েছেন তার হিসেব নেই। তখন মানুষ কল্পনাই করতে পারেনি যে ৮০০০ মিটারেরও বেশি উঁচু এই পর্বতসমূহের উপরেও পদচিহ্ন অঙ্কন করা সম্ভব। সেই পদচিহ্ন অঙ্কনের সর্বপ্রথম প্রয়াস চালান ইংরেজ অভিযাত্রী ও পর্বতারোহী আলবার্ট ফ্রেডেরিক মুমুরি। আধুনিক পর্বতারোহনের অগ্রদূত মুমুরি-ই সর্বপ্রথম কারাকোরাম রেঞ্জের নাঙ্গা পর্বত অভিযানের মাধ্যমে আটহাজার মিটারের অধিক উচু পর্বতে আরোহনের প্রচেষ্টা করেন। তার কল্পনা প্রসূত পর্বতারোহনের পদ্ধতিগুলোই বিংশ শতাব্দীতে এসে গৃহীত হয়। তাই তাকে আধুনিক পর্বতারোহনের জনক বলে মনে করা হয়।


১৮৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ডেভোরে জন্মগ্রহন করা মুমুরি তার বাবার মৃত্যুর পর ভাই উইলিয়ামকে নিয়ে আল্পস পর্বতমালায় পর্বতারোহণ শুরু করেন। কিন্তু তিনি পর্বতারোহণে সবার নজর কাড়েন ১৮৭৯ সালে সুইস পর্বতারোহী আলেজান্ডার বুর্গেনারের সাথে পশ্চিম আল্পসের জমুর্টগ্রাট ও ম্যাটারহর্ন এবং ১৮৮১ সালে গ্রান্ড ক্রামজ(Grands Charmoz) ও গ্রিপন (Aiguille du Grépon) আরোহনের মাধ্যমে। এরপরেও নিজের দক্ষতাকে চুড়ান্ত পর্যায়ে ঝালাই করে নিতে তিনি ককেশাস অঞ্চলেরও বিভিন্ন পর্বতে অভিযান চালান। ককেশাস থেকে ফরে এসে তিনি বুঝতে পারেন তার আকাঙ্খা ও পর্বতের প্রতি আকর্ষন আরো গভীর। তাই তিনি নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে যাচাইয়ের লক্ষ্যে ২০ জুন, ১৮৯৫ হিমালয়ে পদার্পন করেন। তিনি নিজের আত্মবিশ্বাসে এতটাই বলীয়ান ছিলেন যে আরোহনের জন্য বেছে নেন পৃথিবীর নবম উচ্চ কিন্তু দুর্গম, ভয়ংকর ও ‘কিলার মাউন্টেন’ নামে খ্যাত নাঙ্গা পর্বতকে।


মুমুরী তার সহযোদ্ধা হিসেবে তিনজন ব্রিটিশ পর্বতারোহী- জন নরম্যান কলি, গিওফ্রি হাস্টিং, চার্লস ব্রুস ও দুইজন পোর্টার গুর্খাস রঘোবীর থাপা, গামান সিং কে বেছে নেন। তারা আল্পাইন পদ্ধতিতে রুপাল ফেস থেকে যাত্রা শুরু করে জটিল ডায়ামির ফেসের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন এবং প্রায় ৬১০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল যখন তার তিন সহযোদ্ধাই উচ্চতাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বাধ্য হয়ে মুমুরী একাই একজন গাইডকে সাথে নিয়ে নতুন পথ খুঁজতে বেড়িয়ে পড়লেন। ২৪ আগস্ট নাঙ্গা পর্বতের সেকেন্ডারী পিক ‘নাঙ্গা পর্বত ২ ও গ্যালানো পিকের কাছাকাছি যায়গায় ডায়ামা কল থেকে নেমে রাখোইট হিমবাহের দিকে আসা অ্যাভালাঞ্চের সাথে সাথে তিনিও অদৃশ্য হয়ে যান।


হিমালয়ের প্রথম অভিযানে মুমুরী সফল হতে পারেননি ঠিকই কিন্তু তিনি পথ দেখিয়ে গেছেন। অগ্রজদের মধ্যে স্বপ্ন বুনে দিয়ে গিয়েছেন যে হিমালয়ের আকাশচুম্বী পর্বতও আরোহন করা সম্ভব। তারই পথ ধরে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর জার্মান পর্বতারোহী উইলি মার্কেল ১৯৩২ সালে যান নাঙ্গা পর্বত অভিযানে। কিন্তু অভিযান শুরু করতে দেরী করে ফেলায় সে বছর বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়ে যায়। সাথে সহযোদ্ধা হেরন চেওপস পিরামিডে পড়ে গিয়ে মারা গেলে অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরে আসতে হয়। ১৯৩৪ সালে মার্কেল পুনরায় নাঙ্গা পর্বতে ফিরে যান। কিন্তু এবারেও ব্যার্থতার গ্লানি। তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে মার্কেল সহ আরও চারজন আরোহী মারা যান। ১৯৩৭ সালে অভিযান চালান ডাক্তার ভেন। জার্মান ও অস্ট্রিয়ার সেরা আরোহীদের সমন্বয়ে গঠিত সেই দলও ব্যর্থ হয়। ১৪ জুন অ্যাভালাঞ্চে পড়ে হারিয়ে গেলেন সাতজন আরোহী।


১৯২৯ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রথম অভিযান করা জার্মানি পর্বতারোহী পল বাউয়ার ১৯৩৮ সালে এলেন নাঙ্গা অভিযানে। কিন্তু অধরা কিলার মাউন্টেন অধরাই রয়ে গেল। তার সহযোদ্ধা হায়া রাবিটক ও হার্বার্ট রুথস ৭৩০০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় এবারেও ব্যর্থতার ঝুলি নিয়ে ফিরে আসতে হলো। এতগুলো ব্যর্থতার শেকড় খুড়ে বের করতে জার্মান ও অস্ট্রিয়ান একটি দল ১৯৩৯ সালে মুমুরীর আরোহীত ডায়ামির-ফ্লাঙ্ক পথ ধরে অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ৬০০০ মিটারের কাছে বরফ ও পাথরের দেয়াল বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছরগুলোতে কোন অভিযান না হলেও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দুইজন ব্রিটিশ আরোহী- ক্রাচ ও থর্নলি পুনরায় আরোহনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্রেভার্স ও অ্যাভালাঞ্চ তাদেরকেও চিরদিনের মত অদৃশ্য করে দেয়।




তখন পর্যন্ত একত্রিশ জন পর্বতারোহীর জীবন বধ করেও নাঙ্গা পর্বত স্ব মহিমায় অধরাই রয়ে গেল। এদিকে ১৯৩৪ সালের অভিযানে নিহত উইলি মার্কেলের ভাই, জার্মান ডাক্তার- কার্ল হার্লিংকফার ভ্রাতৃত্যবোধের মূর্তপ্রতীক হয়ে নাঙ্গা পর্বত অভিযানে এলেন। সাথে সহযোগী হিসেবে নিয়ে আসলেন মার্কেলের সহযোগী হিসেবে নাঙ্গা পর্বতে আসা পিটার অ্যাসেনব্রেনারকে। কারণ মার্কেলের সাথে আগের অভিযানের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি অন্য যে কোন পর্বতরোহীর তুলনায় নাঙ্গা পর্বত সম্পর্কে বেশি জানতেন। তার সাথে আরও ছিলো অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী এরভিন স্ক্যানিডার, জার্মান আবহাওয়াবিদ আলবার্ট বিটালিং। প্রধান ক্যাম্পের প্রশাসনিক পরিচালক হিসেবে যোগ দিলেন ফির্টজ আউম্যান। এছাড়াও পর্বতারোহী হিসেবে নিয়োগ দিলেন মিউনিখে তরুন বয়সেই অ্যালপাইনিস্ট হিসেবে সুনাম কুঁড়ানো অটো কেম্পটার ও হারম্যান কোলিন্সপ্রিজার। ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব দিলেন হ্যান্স এট্রাল কে। অ্যাসেনব্রেনার ছাড়াও অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী কুনো রাইনারও ছিলেন মূল দলে।


কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে, এমনকি অভিযানের দলনেতা ভাল্টার ফ্রাউয়েনবার্গারকে ছাপিয়ে সবার নজর ছিলো অস্ট্রিয়ার ইন্সব্রুকে জন্মগ্রহন করা হারম্যান বুলের দিকে। বুলের পেশাগত দক্ষতা, অন্যান্য পর্বতারোহীরা যেসব পর্বতকে গ্রীষ্মকালে কঠিন বলতেন সেসব পর্বত শীতকালে আরোহণের অভিজ্ঞতা ও শীতকালে সবচেয়ে কঠিন পথ ধরে বোল্ড ক্লাইম্বিং এর সুনাম স্বভাবতই তাতে সকলের মধ্যমনি করে তুলেছিলো।


সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ১৯৫৩ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তারা ইতালির গেয়োনা বন্দর থেকে তখন পর্যন্ত ৩১ আরোহীর সমাধিভূমি, কিলার মাউন্টেন খ্যাত নাঙ্গা পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। করাচী পৌঁছালো এপ্রিলে শেষ দিকে।


করাচী থেকে তাদের পরবর্তী গন্তব্য সিন্দ মরুভূমি পেরিয়ে রেলযোগে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছানো এবং রাওয়ালপিন্ডি থেকে বিমানে গিলগিট। গিলগিট পর্যন্ত তারা যত সহজে পৌঁছে গেল এর পরের পথটা মোটেই ততটা সহজ ছিল না। কারাকোরাম পর্বতমালার দুর্গমতায় তারা পদে পদে বাঁধা পেতে শুরু হলো। তাদের জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখা ১০ টা জীপের পাঁচটা যাত্রার আগেই বেঁকে বসলো। বাকি পাঁচটা জীপ নিয়ে রাখোইট ব্রীজ পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারলেও এর পরে আর যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারন ইন্দুস উপত্যকার তপ্ত মরুভূমি, গিরিসঙ্কট, দানবাকৃতির পাথরের চাঁই, পাথরধ্বস তথা কোরাকোরামের অদ্ভুত ও দুর্গম ভূ-প্রকৃতি। তাই বাধ্যহয়ে বাকি পথ তাদের পায়ে হেটে ও মালপত্র গাধার পিঠে চাপিয়ে পাড়ি দিতে হলো।


রাইখোট ব্রীজের পর থেকেই রাইখোট উপত্যকার শুরু যা চলে গেছে একদম নাঙ্গা পর্বত পর্যন্ত। কিন্তু এ উপত্যকার নিচের অংশ দিয়ে ট্রাভার্স করে সামনে আগানো সম্ভব না হওয়ায় তাদেরকে দুই হাজার মিটার উচ্চতার একটি বোল্ডারের রিজলাইন ধরে উপরে উঠত হলো। সামনের ঘন জঙ্গলাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালো ফেয়ারলী মিডো-তে। সেখান থেকেই শুরু হলো প্রথম বিপত্তি। হঠাৎ করে তুষার ঝড় শুরু হওয়ায় মাল বহনকারী পোর্টাররা সামনে আগাতে আপত্তি জানালো। ৩০০ জন পোর্টারের বয়ে আনা মাল কি করে বেজক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যাবে সে চিন্তা করেই তারা তাদের প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করলো ফেয়ারলী মিডোর ৩৭০০ মিটার উচ্চতাতেই। প্রথম ক্যাম্প থেকে বেজক্যাম্পের দুরত্ব ৩-৪ ঘন্টা। দিনে দুইবার করে আসা যাওয়া করে সব মালপত্র মূল বেজক্যাম্পে স্থানান্তর করা হলো।


কিন্তু অভিযানের অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো শেরপা নিয়োগ দেয়া। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশদের স্থাপিত ‘হিমালয়ান ক্লাব’এ শেরপাদের প্রশিক্ষন দেয় হত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সূত্র ধরে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যকার চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ইন্ডিয়া থেকে শেরপা সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে পাকিস্তানে কোন পর্বতারোহী প্রশিক্ষন কেন্দ্র না থাকায় তাদেরকে স্থানীয় মানুষদেরই শেরপা হিসেবে নিয়োগ দিতে হচ্ছিলো। সবকিছু বিবেচনায় রেখে তারা হুঞ্জা উপত্যকার স্থানীয় কয়েকজনকে শেরপা হিসেবে নিয়োগ দিলো। কারণ ৩-৪ হাজার মিটার উচ্চতায় বসবাসকারী হুঞ্জারা থেকেই উচ্চতার সাথে অ্যাক্লেমেটাইজড। কিন্তু সমস্যা হলো আইস-এক্স ও দড়ি সম্পর্কে তাদের কোন অভিজ্ঞতা না থাকা। কিন্তু মানুষ হিসেবে সহজ সরল প্রকৃতির, কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমী হওয়ায় তাদেরকেই শেষপর্যন্ত শেরপা হিসেবে নেয়া হলো।


অভিযানের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ২৫ মে তুষারাবৃত মোরেইন ভ্যালীর ৪০০০ মিটার উচ্চতায় তারা তাদের মূল বেজক্যাম্প স্থাপন করল। মোরেইন ভ্যালীর বিশালাকৃতির বোল্ডারের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু ছোট তাবু ও একটা বড় তাবুর সমন্বয়ে তৈরী হলো তাদের ক্যাম্প সাইট। বড় তাবুটিকে তারা তাদের খাবার, মালপত্র ও রেশন সংরক্ষণের স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। রাওয়ালপিন্ডি থেকে সর্বশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেতে সেখানে একটি রেডিও-ও স্থাপন করা হলো। কিন্তু নাঙ্গা পর্বতের উত্তর-পূর্ব পাশে স্থাপন করা মূল বেজক্যাম্প খুব বেশি সুখদায়ক ছিলো না। কারণ মোরেইন পর্বতের ৪০০-৫০০ মিটার গা ঘেষে প্রায়শই নেমে আসা তুষারধ্বস ও তীব্র বাতাস ছিল প্রচন্ড যন্ত্রনাদায়ক।


কিন্তু বুলদের অপেক্ষা করে থাকলে চলবে না। কারণ পূর্বের বেশিরভাগ অভিযানই ব্যর্থ হয়েছিলো বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে আগের অভিযানগুলোর মত তাদেরকেও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই ফিরতে হবে। তাই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান জার্মান বাহিনী মে এর ২৬ তারিখে মোরেইন আইসল্যান্ডের ৪৫০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প ১ স্থাপন করল। দৈত্যাকার একটি বোল্ডারের আড়ালে স্থাপন করা ক্যাম্প ১ অঞ্চলটি নাঙ্গা পর্বতের উত্তর-পূর্ব পাশ থেকে খুবই কাছে হওয়ায় এই অঞ্চলটি ছিল অ্যাভালাঞ্চ(তুষারধ্বস) ও বর্জ্রপাত প্রবন এলাকা। এখান থেকে সামনে ৫৩০০ মিটারের ক্যাম্প ২ পর্যন্ত খাড়া পাথুরে রাখোইট হিমবাহের নিম্নবর্তী অংশ। আরও সামনে এগিয়ে ৬১০০ মিটার উচ্চতায় রাখোইট হিমবাহের উপরের অংশে স্থাপন করা হলো ক্যাম্প ৩।


অগ্রবর্তী অভিযাত্রীরা এখানেই ক্যাম্প ৪ স্থাপন করেছিলো। রাইখোট হিমবাহের এখান থেকেই শুরু হয় হিমবাহের খাড়া ঢাল এবং রাইখোট পিকের গোড়া পর্যন্ত সেই সমান ঢাল জুড়ে ছেঁড়া ফাটা অসংখ্য ক্রেভার্স। রাইখোট পিকের গোড়ায় ৬৭০০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয় ক্যাম্প ৪। এ পর্যন্ত অভিযান মোটামুটি সহজসাধ্যই ছিলো। কিন্তু এখান থেকে সামনে দূর্গের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা ৭০৭০ মিটারের রাইখোট পিক ও তারও সামনে সিলবারস্যাটেল তাদের সাহসিকতার নির্মম পরীক্ষা নেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলো। আগের অভিযাত্রীরা সিলবারস্যাটেলে আরোহন করার জন্য রাইখোট পিক আরোহন না করে সামনে থাকা ফাঁপা হিমবাহ ট্রাভার্স করে যেত। কিন্তু পথিমধ্যে আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেলে ফিরে আসার আর কোন উপায় থাকবে না ভেবে তারা ১৯৩২ সালে অ্যাসেনব্রেনারের দেখানো পথ অনুসরণ করতে মনস্থির করল। পথটি ছিল এমন যে সিলবারস্যাটেল পর্যন্ত যেতে তারা রাইখোট পিক ট্রাভার্স না করে বরং রাইখোট পিকের ও রাইখোট সোল্ডারের পার্শ্বদেশ ধরে আরোহন করে ক্যাম্প ৫ স্থাপন করবে। এবং ক্যাম্প ৫ থেকেই পরবর্তীতে সামিট পুশ দেয়া হবে।




ক্যাম্প ১ থেকেই নাঙ্গা পর্বতের দুর্গমতা তারা পদে পদে অনুভব করতে শুরু করল। প্রায় ৬ সপ্তাহ তারা শুধুমাত্র রাইখোট হিমবাহেই বন্দী হয়ে ছিলো। পুরোটা সময় তাদেরকে ব্যয় করতে হয়েছে ট্রেইল চিহ্নিত করে রাখা, বরফের বিশালাকৃতির ও চোরা চিঁড়গুলো সনাক্ত করতে। উপরন্তু হিমবাহের মাঝের বিপদসঙ্কুল কিন্তু দেখতে নিরীহ এই অঞ্চলটি ছিলো তুষারধ্বসপ্রবন। তবুও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্যাম্প ১ থেকে ক্যাম্প ২ তে পৌঁছাতে প্রায় ৫ ঘন্টা সময় লাগতো।


প্রায়শই তুষারধ্বসের কারণে সৃষ্টি হওয়া ঝড় তাদেরকে আরও বেশি কুপোকাত করে দিচ্ছিলো। হিমবাহের মাঝ বরাবর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঝড়ে মিশ্রিত তুষার স্ফটিক, তীব্র বাতাস থেকে বাঁচতে হুনজা থেকে নিয়ে আসা পোর্টাররা এক অভিনব পদ্ধতি বের করলো। তারা তুষারধ্বস শুরু হওয়া মাত্র পিঠের সকল বোঝা সামনে রেখে, তুষারের মধ্যে তৎক্ষনাৎ গর্ত করে ঢুকে পড়তো আর নিজেদের মুখ ও নাকগুলো পুলওভারের মধ্যে গলিয়ে দিত। পুলওভারের মাঝে সূক্ষ ছিদ্র দিয়ে তখন নিশ্বাসের কাজ চালাতো। কারণ এ ধরনের ঝড়ের স্থায়িত্বকাল থাকত সাধারণত ৫-৬ মিনিট এবং এই সময়ের মধ্যে মুক্তবাতাসে একটা নিশ্বাস নেবারও কোন উপায় থাকতো না। ঝড়ের তীব্রতা শেষ হলে ধীরে ধীরে যখন আবার সূর্যের দেখা মিলত কেউ কেউ ধারণা করে বসত তারা মারা গিয়েছে এবং এখন পরকালে আল্লাহ তা'য়ালার সামনে শুয়ে আছে।


রাইখোট হিমবাহ ধরে সামনের দিয়ে যতই আগানো যায় হিমবাহের মধ্যকার ক্রেভার্সগুলো আরও বেশি বড় হতে শুরু করে। এমনও অনেক যায়গা রয়েছে যেখানে তাদেরকে পুরোটা খাড়া ফাটল ধরে নিচে নেমে আবার সামনের দেয়াল ধরে উঠে পথ চলতে হয়েছে। অবশেষে মে মাসের ৩১ তারিখে তারা ক্যাম্প ২ স্থাপন করতে সমর্থ হয়। তাদের মতে এটাই ছিলো পুরো অভিযানের সবচেয়ে রোমান্টিক ক্যাম্প। একই সাথে সবচেয়ে বেশি ভয়ংকরও। তাবুর উপরে ঝুলে থাকা ১৭০০ মিটারের বরফের দেয়াল, রাইখোট পিক ও সিলবারস্যাটেল পিক থেকে নেমে আসা হ্যাঙ্গিং গ্লেসিয়ারই একইসাথে তাদের রোমাঞ্চ ও ভয়ের কারণ। গ্লেসিয়ার থেকে সামান্য একটা অংশই গড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।


ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩ এর পথটা খুব বেশি দুর্গম না হলেও শেষ অংশের প্রচন্ড খাড়া ও খাঁজকাটা গ্লেসিয়ার-ঢাল অতিক্রম করাটা বেশ কষ্টসাধ্য। ক্যাম্প ২ থেকে প্রথমেই ঢাল ধরে নিচের দিকে নেমে, একটি অ্যাভালাঞ্চের গতিপথ পার করে পুনরায় উপরের দিকে ওঠার এই ঢালটি নিঃসন্দেহে পরিশ্রমলব্ধ। এরই সাথে আবহাওয়া ক্রমশই খারাপ হচ্ছিলো। এই সময়ে তাদেরকে প্রতিটা পা গুনে গুনে সামনে আগাতে হচ্ছিলো। জুনের প্রথম সপ্তাহের পর আবহাওয়া কিছুটা ভালোর দিকে আগালে ১০ জুন হারম্যান বুল ও ফ্রাউয়েনবার্গার ৬১০০ মিটার উচ্চতায় দুইটি তাবুর সাহায্যে ক্যাম্প ৩ স্থাপন করলেন।


পরদিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা দুইজনে ক্যাম্প ৪ এর দিকে রওনা দিলেন। ৬,৪৪৮ মিটারের চোংগ্রা পিকের দক্ষিন ভাগ দিয়ে পথের সন্ধান করতে করতে তারা ৬৭০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু রুপাল ভ্যালী থেকে ধেয়ে আসা ঝড়ের কবলে অগ্রসর হতে না পেরে ক্যাম্প ৩ তে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ১২ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পরবর্তী ৪ দিন ঝড়ের তীব্রতা ক্যাম্প ৩ লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। তাবুর উপরে তুষার জমে প্রথম রাতের পরেই তাবুর পোল ভেঙে যায়। পরে স্কি স্টিকের সাহায্যে কোনরকমে মেরামত করে দুইজনে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেন। নিচের ক্যাম্পগুলোর সাথে সমস্ত রকমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখানেই, ২০০ মিটার সামনে, ১৯৩৪ সালে তাদের পূর্ববর্তী আরোহীরা তুষারঝড়ে পড়ে মারা গিয়েছিল।


আশার আলো পুরোপুরি নিভে যাওয়ার আগে আবহাওয়া আরও একবার অনুকূলে আসল। ইতিমধ্যে ক্যাম্প ১ ও ২ থেকে অতিরিক্ত খাবার ও তাবু নিয়ে আসা অ্যাসেনব্রেনার ও অন্যান্য আরোহীদের নিয়ে পরদিনই তারা ক্যাম্প ৪ স্থাপন করতে সমর্থ হল। তাবু স্থাপন করতে না পারায় ঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে একটি তুষার-গুহা তৈরী করা হয়। এদিকে বুল ও কেম্পটার হাত দেন রাইখোট পিকের দিকে তুষার কেটে পথ বানানোর কাজে। তখন থেকেই বুল তার উদ্যম ও দক্ষতা প্রমাণ করতে শুরু করেন। বুল মনে করতে শুরু করেছিলেন রাইখোট পিক ও তার আইস-টাওয়ার সম্পূর্ণরূপে আরোহণ না করে শুধু নাঙ্গা পর্বত আরোহণ করলে নিজের দক্ষতাকে প্রমাণ করার সুযোগ যেমন মিলবে না তেমনি নিজেকে নিজের কাছে কোনভাবেই সফল বলে মেনে নিতেও পারবেন না।


বুল, অ্যাসেনব্রেনাররা যখন সামিট পুশের জন্য পরিকল্পনা শুরু করলেন ফ্রাউয়েনবার্গার বুঝতে পারছিলেন তিনি আর সামনে আগাতে পারবেন না। তাই তিনি নিচে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। চারদিন পরে বুলদের দল থেকে কুনো রাইনার, যে কিনা শুরু থেকেই ছিলো প্রচন্ড উদ্যমী ও সাহসী, ক্যাম্প ২ তে নেমে গেলে তাদের উদ্যম মুহূর্তেই হতাশায় পরিণত হল। তখন ফ্রাউয়েনবার্গার পুনরায় উপরের দলের সাথে যোগ দিতে ক্যাম্প ৪ এর দিকে রওনা দিলেন। কিন্তু ক্যাম্প ৩ পৌঁছার পর দেখলেন পুরো দল ক্যাম্প ৩ তে ফিরে এসেছে। কারণ খারাপ আবহাওয়ার কারণে তারা রাইখোট আইস সাইডের পরে আর সামনে অগ্রসরই হতে পারেনি। অন্যদিকে পোর্টররাও আর সামনে এগোতে অসম্মতি জানালে ফিরে আসা ছাড়া কোন উপায়ই ছিলো না।


হতাশার কফিনে শেষ পেরেকটিও ফুটিয়ে দিলো জুনের ২৬ তারিখে রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসা আবহাওয়ার পূর্বাভাস। তাতে বলা হলো ২৮ জুন থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। এবারেও কি নাঙ্গা পর্বত অধরাই রয়ে যাবে? একের পর এক খারাপ সংবাদ যখন তাদেরকে আরও বেশি ব্যর্থতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন সবকিছুকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে বুল, কেম্পটার, ফ্রাউয়েনবার্গার ও কোলিনস্প্রিংজার মিলে ক্যাম্প ৫ এর দিকে অগ্রসহ হতে শুরু করলেন। প্রবল আত্মশক্তিতে বলীয়ান হারম্যান বুল একটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলো যে অন্য কেউ না আগালে সে একাই, কোনরূপ তাবু ব্যতীত ক্যাম্প ৫ স্থাপন করে বরফের গুহায় রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো।


পরিকল্পনা মাফিক পরদিন হারম্যান বুল রাইখোট পিক ট্রাভার্স করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন বটে কিন্তু এ যাত্রায় বৃষ্টির সাথে দৌড়ে আবারও হেরে যেতে হলো। প্রয়লঙ্কাররী ঝড় ও তীব্র তুষারপাতের কারণে তিনি ক্যাম্প ৪-এ ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে ক্যাম্প ৪-এ অবস্থান করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়লো। তুষারের স্তুপ জমে ক্যাম্প ৪ বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেলে তারা হ্যান্স এর্টারের সাথে ক্যাম্প ৩ তে এসে যোগ দিলেন।


সবকিছু যখন অনিশ্চয়তায় ভুগছে, আসন্ন ব্যর্থতা যখন সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে, পোর্টাররাও যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখনও তারা নিভু নিভু করতে জ্বলতে থাকা প্রদীপের সলতেটা আরও একবার উশকে দিতে বদ্ধ পরিকর। এমন সময়ে অ্যাসেনব্রেইনার ব্যক্তিগত কারণে ও কোলিনস্প্রিনজার ক্যাম্প ৪ এ থাকতে দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে বেজক্যাম্পে নেমে যেতে বাধ্য হন। ক্যাম্প ৩ তে রইলেন হ্যান্স, কেম্পটার, বুল ও ফ্রাউয়েনবার্গার এবং সাথে মাত্র ৪ জন পোর্টার। হতাশাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে নাঙ্গা পর্বত জয়ের জন্য শেষ প্রচেষ্টায় যখন মত্ত তখন তাদের হতাশাকে আরও এক কাঠি বাড়িয়ে দিতে বেজক্যাম্প থেকে জানানো হলো নিচে নেমে যাওয়ার জন্য।


বুলরা যখন চুড়ান্ত সফলতার জন্য নিজেদের মনোভাকে প্রশস্ত করছিল তখনই বেজক্যাম্প থেকে আসা এমন নির্দেশে তারা নিমিষেই মুড়ষে পড়লো। বেজক্যাম্প থেকে এই নির্দেশের সাথে সাথে তারা আরও একটি সংবাদ পেলো- গত ২৯ মে ব্রিটিশ দল পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট আরোহন করে ফেলেছে। এই সংবাদটা তাদের জন্য টনিকের মত কাজ করলো। পর্বতারোহন যুগের শুরু থেকে তৎকালীন পরাশক্তি দেশগুলো পর্বতারোহনকে শুধু একটা ক্রীড়া হিসেবেই নেয়নি বরং নিজেদের কতৃত্ব ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও বেছে নিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় যখন ইংরেজরা এভারেস্ট আরোহন করে ফেলল তখন প্রবল জাত্যাভিমানে বলীয়ান হ্যান্স-বুলদের কতৃত্ব ধরে রাখার জন্য নাঙ্গা পর্বত আরোহন করার কোন বিকল্পও ছিলো না।


দলনেতার আদেশ অমান্য করে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য বুলের থেকেও বেশি কঠোর মনোভাবাপন্ন ছিল হ্যান্স এর্টার। বেজক্যাম্প থেকে আসা নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে তিনি প্রতিত্তরে বলেন -

“গোথের ফ্রস্টই আমার পড়া একমাত্র কবিতা না।”

হারম্যান বুলকে মূলত হ্যান্স ও অ্যাসেনব্রেনারই বেশি প্রভাবিত করেছিল। বুলেরও আত্মসম্মানবোধ ও জাত্যাভিমান ছিলো আকাশচুম্বী। তাই যখন তিনি বেজক্যাম্প থেকে জানতে পারে ব্রিটিশরা এভারেস্ট সামিট করে ফেলেছে তখন তার মধ্যেও একটা একরোখা জেদ ও অভিমান চেপে বসে। ক্যাম্প ৫-এর দিকে রওনা হবার আগে তিনি তার পরিবারকে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন-

…এবং আমি তোমাকে বলছি- যদি আমরা শীর্ষে পৌঁছাতে পারি তবে এটা হবে আমাদেরই নিজস্ব অর্জন।

সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে ব্যর্থতাকে বরণ করে নিতে তারা শুধু বদ্ধ পরিকরই ছিলো না, তার জন্য যেকোন মূল্য দিতেও প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত লড়াই করে দেখার মানসিকতা ও সাহস নিয়ে তারা ক্যাম্প ৩ তেই রয়ে গেলন। তাদের সাহসিকতাকে প্রকৃতিও বোধহয় শ্রদ্ধা করলো। পরদিন অর্থাৎ জুনের ৩০ তারিখে আশ্চার্যজনকভাবে আবহাওয়া ভালো হয়ে গেলো। রিজ লাইন আটকে রাখা মেঘগুলো সরে যেতে শুরু করল। তাই তারা পরদিন শেষবারের মত প্রচেষ্টা চালানোর কথা বেজক্যাম্পে জানিয়ে দিলো।



রাইখোট পিক ও সিলবারস্যাটেলের খাড়া রিজলাইনে জমে থাকা তুষারের স্তুপে সকালের সূর্য জ্বলজ্বল করে উঠে জানান দিয়ে দিলো প্রকৃতি তাদের সাথেই আছে। অন্যদিকে মাত্র কিছুদিন আগে হাইস রেবিটস্কের নেতৃত্বে জার্মান-অস্ট্রিয়ান দলের জয় করা ৭৮০০ মিটারের মাউন্ট রাকাপোশি তাদের উদ্দীপনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ১ জুলাই তারা ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছে যেতে ও নিজেদের দক্ষতাকে শেষ বারের মত ঝালাই করে নিতে বুল ও হ্যান্স ওইদিনই রাইখোট পিক আরোহনের করলেন।


বুলদের অধ্যাবসায় ও সাহসিকতার জন্য নাঙ্গা পর্বত যেন এবার নিজ থেকেই ধরা দিতে চাচ্ছে। পরদিনও আবহাওয়া একই রইলো। কিন্তু বেঁকে বসলো পোর্টাররা। আগেরদিনরাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় ও অসুস্থতার জন্য তারা সামনে আগাতে অপরাগতা প্রকাশ করে বসলো। কোন কিছুতেই যখন কোন লাভ হচ্ছিলো না তখন নিজেরাই নিজেদের রসদ বহন করে সামনে আগানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। শুরু হলো শেষ প্রচেষ্টা। চারিদিকে নিরন্তর শূন্যতার মাঝে তাদের অসীম অধ্যাবসায়ের নিরব সাক্ষী হয়ে রইলো মুর’স হেড। এই মুর’স হেডেই ১৯৩৪ সালে ইউলি মার্কেল সহ বহু পর্বতারোহীন জীবনাবসান ঘটে গেছে।


মুর’স হেড ট্রাভার্স করে সামনে এগিয়ে প্রায় ৭০০০ মিটার উচ্চতার এই প্রথমবারের মত তারা তাদের ক্যাম্প ৫ স্থাপন করতে সমর্থ হলো। এখান থেকেই সামিট পুশ দেয়ার পরিকল্পনা করা হলো। পোর্টার স্বল্পতার কারণে তারা মাত্র একটা তাবু ও দুইটা স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে আসতে পেরেছিলো। যেহেতু বুল ও কেম্পটার সবচেয়ে বেশি অ্যাক্লেমেটাইজড ছিলো তাই তারা দুইজনে ক্যাম্প ৫-এ অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন ও বাকিদেরকে নিচে ক্যাম্প ৪-এ নেমে যেতে বাধ্য করলেন।


এ পর্যন্ত তারা মোট উচ্চতার দুই তৃতীয়াংশ উঠতে সমর্থ হয়েছে। সামনে রয়েছে ১৪০০ মিটারের বাঁধা। ক্যাম্প ৫ থেকে সামিটের দুরত্ব ৬ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে অর্জন করতে হবে ১৪০০ মিটার উচ্চতা। সাধারণত হিমালয় অভিযানে এত উঁচুতে ও এতখানি দুরত্বের জন্য ২-৩ টা ক্যাম্পের দরকার হয়। কিন্তু পোর্টার, অক্সিজেন ও অন্যান্য রসদের ঘাটতি থাকায় এখান থেকেই সামিটের জন্য চেষ্টা করা ছাড়া কোন উপায়ই নেই। এখান থেকে প্রথমে সিলবারস্যাটেলের পূর্বপাশের গিরিশিরা ধরে এগিয়ে গিয়ে অতিক্রম করতে হবে ছোট্ট একটি অধিত্যকা। আরও সামনে হোয়াইট পিরামিড পেরিয়ে ফলস সামিট থেকে নিচে নেমে আবার ৪০০ মিটার উঠলে তবেই কাঙ্খিত নাঙ্গা পর্বতের চূঁড়া।


এতখানি দুরত্ব পাড়ি দেবার জন্য সামিটের উদ্দেশ্যে তাড়াতাড়িই রওনা দেয়া উচিত বলে বুল রাত ২ টায় বের হওয়ার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কেম্পটার অসুস্থ বোধ করায় বিলম্ব হতে থাকে। বিচক্ষন বুল বুঝতে পারছিলেন কেম্পটারের পক্ষে সামিটের জন্য বের হওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে এত উচ্চতায় আরও একদিন অপেক্ষা করা শুধু মূর্খতাই নাই, হটকারিতারও সামিল; যখন থাকার জন্য ভালো তাবু নেই, খাবার নেই, অক্সিজেন নেই। তাই বুল সিদ্ধান্ত নিলেন একাই সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন। রাত আড়াইটার দিকে বুল একাই চললেন নাঙ্গা চূঁড়ায় বিজয় নিশান ওড়াতে।


সে রাতের তাপমাত্রা ছিলো মাইনাস ৪০-৪৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। এই প্রচন্ড ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে, সারারাত শুধু চাঁদকে সাথী করে, তীক্ষ্ণ বরফ, তীব্র বাতাস ভেঙে ভোর পাঁচটার দিকে তিনি সিলভার নিডেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেন। সেখানকার দৈত্যাকৃতির বিশাল ওভারহ্যাংটার নিচেই ১৯৩৪ সালের অভিযানের ক্যাম্প ৪ স্থাপন করা হয়েছিলো। এরই মাঝে দিগন্তে নতুন সূর্যের দেখা মিললো। জ্বলজ্বলে আলো আরও একটি ভালো দিনের প্রত্যাশা দেখাতে শুরু করলো। চারিদিকের ধূ ধূ শূণ্যতার মাঝে বুল দূরে, ক্যাম্প ৫ এর কাছে একটি কালো বিন্দুর মত দেখতে পেলেন। বুল রওনা হবার ঘন্টাখানেক পর কেম্পটারও তার পদচিহ্ন অনুসরণ করতে শুরু করেছে।


সিলভার নিডেল থেকে সিলবারস্যাটেল বেশ কাছে হলেও কোন রকম কৃত্রিম অক্সিজেন না থাকায়, বাতাসের পাতলা স্তর ভেদ করে সামনে আগাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো। তার উপর একের পর এক বরফের ধাপ কেটে খুবই সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিলো। কারণ ভুল হলে সেটা একবারই হবে। একবার পা ফসকালে ২০০০ মিটার নিচের ক্যাম্প ২ তে গিয়ে পড়তে হবে। প্রবল হিমঝঁঝায় বিধ্বস্ত সামনের ৩ কিলোমিটারের অধিত্যকাটি তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলো সামনের অচিন্তনীয় দূর্গমতার কথা। অধিত্যকা পেরিয়ে ৭১৯০ মিটারের সেকেন্ডারী সামিটে থেকে খাড়া ঢাল ধরে ১০০ মিটার নামলে বাজহিন নচ। এরপরের ২০০ মিটার পুরো নাঙ্গা পর্বতের গঠনশৈলীর সবচেয়ে দুর্গম পথ। যেই পথ পাড়ি দিতে বুল ভেবেছিলেন দেড় ঘন্টা লাগবে সেই পথই পাকা দুইঘন্টায় পাড়ি দিয়ে সকাল ৭ টায় ৭৪৫০ মিটার উচ্চতায় সিলবারস্যাটেলে এসে পৌঁছালেন। এটাই নাঙ্গা শীর্ষে পৌঁছানোর সামিট গেট। বুল চাচ্ছিলেন একটু বিশ্রাম নিতে। কিন্তু এক মুহূর্ত অবকাশের সুযোগ নেই। এখান থেকে প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা সেকেন্ডই মূল্যবান।


সিলবারস্যাটেল আরোহন করা প্রচুর শ্রমসাধ্য ছিলো। প্রতিটা পদক্ষেপে বুল বুঝতে পারছিলেন তিনি তার সাধ্যের চরম মুহূর্তে পৌঁছে গেছেন। একের পর এক ইস্পাত কঠিন বরফের খাঁজে পা গেঁথে গেঁথে আগাচ্ছিলেন। কোনরকম কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া ৭৫০০ মিটার উচ্চতায় প্রতিটা পা ফেলতেই কালঘাম ছুটে যাওয়ার অবস্থা হচ্ছিলো। প্রথম দিকে একটা পা ফেলে দুইবার করে নিঃশ্বাস নিতে হতো। শেষ পর্যন্ত তা এসে পৌঁছালো পাঁচ বারে। প্রতি মুহূর্তে প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে সিদ্ধ হয়ে আরও একটা পা আগাতে আগাতে একঘন্টা পরে তিনি মাত্র ২০০ মিটার আরোহন করতে সক্ষম হলেন।


এরপরের সেকেন্ডারী সামিটের খাড়া ঢালের শুরুতে তিনি পুরোপুরি অসমর্থ হয়ে পড়লেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সাথে সবকিছু এখানেই ফেলে রেখে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনকি যেতেহু তিনি সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবেন তাই সাথে থাকা সমস্ত খাবারও ফেলে রেখে গেলেন। সাথে নিলেন আইস-অ্যাক্স, পতাকা, ক্যামেরা, দুইটা স্কি-স্টিক আর একটা ফ্লাস্কে আধা লিটারের মত গরম পানি। এই সামান্য রসদ নিয়েই রওনা দিলেন।


মধ্যদুপুরের দিকে সেকেন্ডারী সামিটের সামান্য নিচে একটি ছোট খাঁজে পৌঁছালেন। সেখান থেকে দূরে ছোট একটি বিন্দুর ন্যায় কেম্পটারকে দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরেও কেম্পটারের কোন নড়াচড়া দেখতে না পেয়ে আবারও একাই সামনে আগানোর চিন্তা করলেন। প্রথম অংশটা খাঁজের চিড় ধরে সহজেই নেমে গেলেন। কিন্তু ওঠার সময় বুঝতে পারলেন এই অপরাজেয় দেয়াল প্রতিটা সেকেন্ডে তাকে পিছনের দিকে টানছে। প্রচন্ড দুর্বলতা তাকে বার বার ক্ষানিকটা বিশ্রামের কথা মনে করিয়ে দিলেও তিনি কোথাও বসতে সম্পূর্ণ অপরাগ, পাছে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রায় দুপুর দুইটার দিকে বাজহিন নচে পৌঁছালেন।


নাঙ্গা পর্বতের সমস্ত সৌন্দর্য এই নচেই লুকিয়ে আছে। একটা পাশ দিয়ে সোজা চলে গেছে মূল শীর্ষের দিকে। উত্তর দিকে ৪০০ মিটারের দেয়াল পেরিয়ে ডায়ামির ফেস অন্যদিকে পশ্চিমে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত গাত্র-৫০০০ মিটারের রুপাল ফেস, নাঙ্গা পর্বতের দক্ষিণগাত্র। সময় চলে যাচ্ছে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসছে কিন্তু শীর্ষ আর কাছেই আসছে না। ক্রমে তিনি আশা হারিয়ে ফেলছিলেন। যখন তিনি ভাবছিলেন তিনি সোল্ডারের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন ঠিক তখনই দেখতে পেলেন একটি ছোট টাওয়ার তার পথ অবরোধ করে আছে। তিনি এই দুর্বল শরীর নিয়ে এই বাঁধাকে আরোহন করে অতিক্রম করতে পারবেন না বুঝতে পেরে অন্য পথ খুঁজতে থাকলেন। অন্য একটাই পথ খোলা আছে। প্রায় ৫০-৬০ মিটারের একটা পর্বতগাত্র আরোহন করে সোল্ডারে পৌঁছানো। বুলের মতে এটা ছিলো সবচেয়ে কঠিন আরোহন। প্রায় সন্ধ্যা ৬ টা নাগাদ এই প্রথমবারের মত আট হাজার মিটার অতিক্রম করে তিনি ৮০৮৬ মিটার উচ্চতায় সোল্ডার পৌঁছালেন।


সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাঙ্খিত সাফল্য। আর কিছু মূহূর্ত ও সামান্য অধ্যাবসায় তাকে পড়িয়ে দিবে বিজয় মুকুট। কিন্তু শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়লো যে তিনি ভাবলেন তিনি আর সামনে এগোতেই পারবেন না। শেষ মুহূর্তে এসে হেরে যাওয়ার ব্যর্থতা এড়াতে সাথে থাকা বাকি সবকিছুও এখানেই ফেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্যামেরা, আইস-এক্স ও পতাকা নিয়ে চললেন বিজয় যাত্রায়।


সোল্ডার ধরে চলার কারণে দুর্গমতা কমছে বটে কিন্তু প্রতিটি নড়াচড়া করার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও প্রচন্ড শ্রম। না পেরে শেষপর্যন্ত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে আগাতে লাগলেন আর সর্বোচ্চ বিন্দুটির সন্ধান করতে লাগলেন। সামনে মাত্র কয়েক মিটারের সামান্য একটি খাঁড়া বাধা। এটি পেরোলেই নাঙ্গা পর্বতের সর্বোচ্চ বিন্দু। শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এই ঢালটা বেয়ে উপরে উঠলেন তখন ঘড়িতে সময় সন্ধ্যা ৭ টা। ক্যাম্প ৫ থেকে রওনা দিয়ে সতেরো ঘন্টা পড়ে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে, কোন রকম কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই তিনি পদ চিহ্ন অঙ্কন করলেন নাঙ্গা পর্বত শীর্ষে।


এমন অভূতপূর্ব খুশির মুহূর্ত কিন্তু বুল এতটাই বিপর্যস্ত ছিলেন যে খুশি উৎযাপন করার অবস্থাও তার রইলো না। এই মুহূর্তের গুরুত্বও তিনি বুঝতে পারছিলেন না। প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অভাবে মুড়ষে পড়লেন। এমনকি নাঙ্গা পর্বত নামটাও তার মনে কোন শিহরণের উদ্বেগ ঘটাতে পারছে না। তিনি শুধু নিজেকে বলে যাচ্ছিলেন আর সামনে আগাতে হবে না, এবার ফিরতে পারবেন। কিন্তু ফেরার আগে সামিট ক্লেইমের প্রমানস্বরূপ নিজের আইস-অ্যাক্সে ট্রিটল ও পাকিস্তানের পতাকা বেঁধে কিছু ছবি তুলতে চাইলেন।


সূর্য ইতিমধ্যে ডুবে গিয়েছে। সিলবারস্যাটেলের ছায়া ক্যাম্প ৫ এর উপর পড়ে ধীরে ধীরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সেকেন্ডারি সামিট, রাইখোট পিক, ক্যাম্প ৫ ও রুপাল ভ্যালীর দিকে কিছু ছবি তুললেন। শেষ বারের মত নাঙ্গা শীর্ষ থেকে দেখে নিলেন প্যানারোমা ভিউ। তারই বর্ণনা দিতে গিয়ে বুল বলেন-

আশেপাশে শত শত মাইলজুড়ে শুধুই পর্বতের সাগর। তারও উপরে সবকিছুর থেকে হাজার মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা কোন আইল্যান্ড।

এবার ফেরার পালা। সূর্য অস্ত গিয়েছে অনেক সময় হয়ে গেল। চারপাশ ধীরে ধীরে আরও শীতল হয়ে উঠছে। রাত পৌনে আটটার দিকে আসার পথ ধরেই ফিরতে শুরু করলেন। সাথে থাকা পাকিস্তানের পতাকা আইস অ্যাক্সের সাথে বেঁধে নাঙ্গার শীর্ষেই রেখে আসলেন প্রমান স্বরূপ। আর স্মারকচিহ্ন হিসেবে ট্রিটলের পতাকা ও সামিট থেকে কিছু পাথর নিয়ে আসলেন।


যেহেতু বুল তার সমস্ত জিনিস আগেই ফেলে এসেছেন, এদিকে রাতও হয়ে গিয়েছে, রাতটা পার করার জন্য কোন স্লিপিং ব্যাগও নেই, পানি নেই, নেই কোন খাবারও তাই জীবন বাঁচাতে ক্যাম্প ৫ পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলেও ফেলে আসা স্লিপিং ব্যাগ পর্যন্ত অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। বাজহিন নচের রিজ লাইনটিকে ক্ষুদার্থ-তৃষ্ণার্ত বুলের এবার আরও কঠিনতর মনে হচ্ছিলো। তার সাথে কোন রসদ, দড়ি না থাকায় তিনি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেন। উত্তরপাশের রাস্তা ধরে সহজেই নিচে নেমে সেকেন্ডারী সামিটকে ট্রাভার্স করে আসতে চাইলেন।


সবকিছু ভালোই চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে একটা খাড়া ঢালে বসে তার ডান বুটের ক্রাম্পন খুলে গেলো। এতটাই বেকায়দা অবস্থায় ক্রাম্পন খুলে গেলো যে সেটা বাঁধারও কোন উপায় রইলো না। শুধুমাত্র স্কি স্টিকের সাহায্যে ভাগ্যজোরে সেই মৃত্যুফাঁদ থেকে বেড়িয়ে আসলেন। একটি সঙ্কীর্ণ শৈলশিরা খুঁজে পেয়ে তারই ফাঁকে একটি পা গলিয়ে দিয়ে এ যাত্রায় রক্ষা পেলেন। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেলে আসা ব্যাগ পর্যন্ত যাওয়া আর সম্ভব হলো না। সেখানেই মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বিভুয়াক করে রাতটা পার করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো। কিন্তু বিভুয়াক করার মত প্রয়োজনীয় সরাঞ্জামও তিনি তার র‍্যাকসাকে, সেকেন্ডারি সামিটের নিচে ফেলে রেখে এসেছেন।


এমন অবস্থায় তার যে চিন্তিত হওয়া দরকার সেই বোধশক্তিটুকুই তিনি হারিয়ে ফেললেন। শুধুমাত্র ঠান্ডায় জমে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে, শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে কয়েকটা পাডুটিন ট্যাবলেটই খেতে পারলেন। আধো ঘুম, আধো জাগরনে, একটি নতুন দিনের, নতুন সূর্যের প্রত্যাশ্যায় ৮০০০ মিটার উচ্চতায় একটি খাড়া দেয়ালে হেলান দিয়েই ভয়ংকর শীতলতম রাতটি পার করতে লাগলেন। এত কিছুর মাঝেও একমাত্র আশার কথা আবহাওয়া এখনও ভালোই আছে। প্রকৃতি যেন বুলকে নিজের সন্তানের মত গ্রহন করে আগলে রেখেছে।


পরদিন ভোর পাঁচটায় তিনি পুনরায় নামতে শুরু করলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হ্যালুসিনেশনে ভুগতে শুরু করলেন। দুপুরের কাছাকাছি সময়ে তিনি বাজহিন নচে পৌঁছাতে সমর্থ হলেন। এখান থেকে সমস্ত পথই তার পরিচিত। হ্যালুসিনেশনের কারণে তিনি ভাবতে শুরু করলেন তিনি তার নিজ বাড়িতেই আছেন। ছুটির দিনে স্কি করতে এসেছেন। কিন্তু খানিক বাদেই বাস্তবে ফিরে এসে বুঝতে পারছিলেন তিনি একাকী নাঙ্গা পর্বতে পড়ে আছেন। তার সাথে খাবার, পানি কিছুই নেই। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেকেন্ডারী সামিটের খাড়া দেয়াল। ক্ষুদা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে এখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙলো একঘন্টা পরে।


সেকেন্ডারি সামিটের এই সামান্য দেয়ালটুকুর প্রতিটা পদক্ষেপ প্রচন্ড যন্ত্রণা দিতে শুরু করলো। এক ঘন্টায় মাত্র ৩০ মিটার আরোহন করতে সমর্থ হলেন। তার চোখদুটো শুধু দিগন্তের সন্ধান করছিলো যেখানে তিনি সামান্য খাবার পেতে পারেন কিংবা এক ফ্লাস্ক চা। তখনই তিনি সামনে দূরে কিছু কালো বিন্দু দেখতে পেলেন। তিনি চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকতে চাইলেন কিন্তু আবারও বুঝতে পারলেন সবই হ্যালুসিনেশন। বিন্দুগুলো দূরের চোংগ্রা পিকের কিছু শৈলখন্ড।


সেকেন্ডারি সামিটের নিচে তিনি তার ফেলে যাওয়া ব্যাগ তুষারাবৃত অবস্থায় খুঁজে পেলেন। ব্যাগে সামান্য কিছু খাবার ছিলো। দুইদিন ধরে অভুক্ত বুল সেই তুষারযুক্ত খাবারই মুখে তুললেন। কিন্তু তিনি জানতেন তুষার খেতে শুরু করলে তার তৃষ্ণা মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে, আর এই মুহূর্তে তার কাছে কোন পানিও নেই।


সামনের অধিত্যকা তাকে মৃত্যু যন্ত্রনা দিতে শুরু করলো। তিনি সাপের মত হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগলেন। প্রতিটা পা ফেলে ২০ বার করে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছিলো। এই মুহূর্তে তার ইচ্ছাশক্তি বলতে এইটুকুই অবশিষ্ট রইলো যে সামনে না আগালে আরও একটি রাত এই মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করতে হবে। বিকেল পৌঁনে ছয়টার দিকে তিনি সিলবারস্যাটেল পৌঁছালেন। এই প্রথম বারের মত তিনি রাইখোট গ্লেসিয়ার ও বেজক্যাম্প দেখতে পেলেন। কি স্বর্গীয় দৃশ্য!


এবারে রাইখোট পিকের দিকে তিনি সত্যিই দুইটি কালো ফুটকির মত দেখতে পেলেন। তার সতীর্থরা তার জন্য এখনও অপেক্ষা করছে এটাই তাকে সামনের পথটুকু পাড়ি দেবার প্রেরণা দিচ্ছিলো। অবশেষে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ৪০ ঘন্টারও বেশি সময় পরে তিনি ক্যাম্প ৫ এর ছোট্ট তাবুতে পৌঁছাতে পারলেন। এদিকে ফ্রাউয়েনবার্গার ও হ্যান্স আগে থেকেই ক্যাম্প-৫ এ ছিলেন। বুলকে মুর’স হেড থেকে দেখতে পেয়ে তারাও সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিলেন। অবশেষে ১৯৯৫ সালে আধুনিক পর্বতারোহনের জনক মুমুরী যে স্বপ্নের পিরামিডের ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন সুদীর্ঘ ৫৮ বছর বছর পরে তারই উপরে পদচিহ্ন স্পর্শ করলেন আরেক কিংবদন্তী হ্যারম্যান বুল।


পর্বতের প্রতি প্রকৃত প্রেমের স্বরূপ উদঘাটন করতে গিয়ে বুল সৃষ্টি করেছেন এর অনবদ্য ইতিহাসের। তিনি নিজের স্বত্তা দিয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পর্বতের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তাইতো নাঙ্গা পর্বত আরোহনের জন্য হারম্যান বুলের কঠোর অধ্যাবসায়, শ্রম ও দক্ষতাকে প্রকৃতিও বোধহয় সাদরে বরণ করে নিয়েছিলো। একারণেই বুল ফিরে এসে বলেছিলেন-

আমরা এই (নাঙ্গা) পর্বতকে পরাস্ত বা জয় করিনি। কিন্তু আমরা এটাতে আরোহন করছি শুধু; কারণ এটা আমার উপর সদয় ছিলো।


 

তথ্যসূত্রঃ

[১] Nanga Parbat Pilgrimage by Hermann Buhl

[২] Nanga Parbat by Karl M Herrligkoffer

[৩] www.alpinist.com

[৪] www.thoughtco.com

[৫] www.himalayamasala.com

[৬] www.helmut-schmidt-online.de

[৭] publications.americanalpineclub.org