কে কালপুরুষ?

কে কালপুরুষ? কেনই বা কালপুরুষ?

কালপুরুষ। ইংরেজীতে যাকে বলা হয় ‘Orion’. একে কখনও কখনও আকাশের সবচেয়ে বেশি পরিচিত তারকামন্ডল মনে করা হয়। কারণ মহাকাশের বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থান করায় পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে একে দেখা যায়। ধনুক হাতে কোন শিকারীকে নির্দেশ করা এই তারামন্ডলে প্রচুর তারকা থাকলেও ল্যাম্বডা অরিয়নিস(মৃগশিরা)- যাকে বলা হয় কালপুরুষের মাথা, কালপুরুষের কোমরবন্ধ হিসেবে পরিচিত জিটা অরিয়নিস(ঊষা), এপসাইলন অরিয়নিস(অনিরুদ্ধ) ও ডেল্টা অরিয়নিস(চিত্রলেখ), ডান কাঁধে অবস্থিত আলফা অরিয়নিস বা আর্দ্রা এবং বাম কাঁধে গামা অরিয়নিস(কার্তিকেয়), ডান হাটু কাপ্পা অরিয়নিস(কার্তবীর্য), বাঁ পায়ের তলায় অবস্থিত বিটা অরিয়নিস(বাণরাজা), কালপুরুষের তরবারির ডগায় অবস্থিত আইওটা অরিয়নিস, ইটা অরিয়নিস বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।

কালপুরুষ নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে পুরাণ ইতিহাসে অনেক মিথ প্রচলিত আছে। যেমন- সুমেরীয়রা কালপুরুষ মণ্ডলকে একটি জাহাজ হিসেবে কল্পনা করত। আবার প্রাচীন চীনে এটি ছিল রাশিচক্রের ২৮ টি রাশির একটি যার প্রতীক ছিল Xiu (宿)। এই রাশিটি সেখানে শেন নামে পরিচিত ছিল যার অর্থ তিন। কালপুরুষের কোমরবন্ধের তিনটি তারা দেখেই তারা এই নামকরণ করেছিল। আবার প্রাচীন মিশরে এই মণ্ডলের তারাগুলো মৃত্যু এবং পাতালপুরীর দেবী অসিরিসের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বলা হয়ে থাকে যে গিজা পিরামিড কমপ্লেক্স এই কালপুরুষের কোমরবন্ধের তিনটি তারার মানচিত্র অনুসারে তৈরি করা হয়েছে। এই কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে গিজার গ্রেট পিরামিড, খফ্রুর পিরামিড এবং মেঙ্কাউ-রার পিরামিড।

এসব নিতান্তই ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ শোনানোর মত। এর কোন কিছুই এই ব্লগের নামকরণের ক্ষেত্রে অতটা ভুমিকা রাখে না। কিন্তু ভারতীয় দর্শন, প্রাচীন উপনিষদে উল্লেখ্য আছে যে ‘কালপুরুষ’ যাকে ভর করে তার ঘরে থাকা হয় না। সে ঘরছাড়া হয়ে, ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কোথাও সে আর বাসা বাঁধতে পারে না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমার উপরেও কালপুরুষ যেন ভর করেছে। স্থান-কাল-পাত্র জানি না কখন এই কালপুরুষের ছায়া আমার উপরে পড়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়। কোথাও দুদন্ড স্থির হয়ে থাকা আমার পক্ষে খুবই কষ্টকর। এই ‘কালপুরুষ’ আমার সেই ছন্নছাড়া জীবনগাঁথা।

আমার এই ছন্নছাড়া জীবনটা কালস্রোতে নিতান্তই ক্ষুদ্র হলেও আমার কাছে বেশ ঘটনাবহুল। এই বিবাগী জীবনে নানা ধরনের মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, নানা ধরনের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। আমি জানি এসব কিছুই না। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাগুলো যেন মহাকালে বা স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যেতে না পারে সেজন্য একে একে সব লিখে ফেলি। কিন্তু সময়ের অভাবই হোক কিংবা আলসেমী-ই হোক সেটা পেরে উঠিনা। তবুও আমার সেই জীবধারাকে বা জীবনদর্শনকে বোকাবাক্সে বন্দী করে রাখার জন্যই এই ‘কালপুরুষ’ এর সৃষ্টি।

মানুষজন আমার এই ছন্নছাড়া হওয়াকে বলে ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমি কখনো ঘুরতে যাই না। ড্যান ব্রাউন তার ল্যাংডন সিরিজের সর্বশেষ বই ‘অরিজিন’এ আমাদের জীবনের দুইটি মৌলিক প্রশ্নের কথা উল্লেখ্য করেছেন- ‘আমরা কোথা থেকে এসেছি আর আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ কিন্তু আমার মনে হয় এই দুইটি মৌলিক প্রশ্নের আগেও যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- ‘আমরা কেন এসেছি?’ পৃথিবী নামক সুন্দর গ্রহে আমরা কেন এসেছি? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই ‘অরিজিন’ ও ‘ডেস্টিনেশন’এর উত্তর খোঁজার থেকে এই ‘কেন’ প্রশ্নটাই আমাকে প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত করে। জাপানী একটা প্রবাদ আছে- ‘মানুষের জীবনের অর্থ খুঁজে পাবার আগেই মানুষ তার অর্ধেক জীবন নষ্ট করে ফেলে।’ আমি প্রতিমুহূর্তে চেষ্টা করছি সেই অর্থটা খুঁজে বের করতে। পথ থেকে পথে, দেশ থেকে দেশান্তরে। বান্দরবনের পাষাণের স্নেহ ধারা থেকে শুরু করে হিমালয়ের শুভ্র তুষারচূড়া, প্রতিটি পাথরের খাঁজে খাঁজে, প্রতিটি হিমবাহ গলে বয়ে চলা নীলাভ নির্ঝরিনীর বিন্দুতে আমি খুঁজে ফিরি মৃত সঞ্জীবনী মন্ত্র।


কেন পাহাড়?

অনেককে বলতে শুনি পাহাড়ে যায় পাহাড়ের সৌন্দর্যকে দেখতে, উপভোগ করতে। পর্বতারোহী এন্ড্রু গ্রিগস তার ‘সামিট ফিভার’ বইতে বলেছেন, “There is no point in going to a mountain with a ‘let’s see how it looks’ attitude.” বাস্তবিকপক্ষে পাহাড়কে দেখতে যাওয়ার কিছু নেই। পাহাড় থেকে শিখতে হয়। শিখতে হয় অধ্যাবসায়, সহিষ্ণুতা, বিনয়, উদারতা। আপনি যখন সোল্ডারের উপর রিজলাইন ধরে হেটে যাচ্ছেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ মনে করিয়ে দিবে আপনার প্রস্তুতির প্রতিটি Sit ups, press ups, toe ups, bullworker এর কথা। পাহাড় আপনাকে শিখাবে বিনয়, শিখাবে বারবার ফিরে আসা।

পাহাড়ে অনেক কিছু শেখার আছে। পাহাড়কে কখনও জয় করা যায় না। পাহাড়কে ভালোবাসতে হয়, শ্রদ্ধা করতে হয়, বিনয়ী হতে হয়, শিক্ষা নিতে হয়। জীবনে বাঁচতে গেলে ব্যর্থতা, অবহেলা, ভুলের দরকার আছে। কিছু একটা করার প্রেরণা তো এখান থেকেই আসে। আবার পাহাড়ই আমাকে শিক্ষা দেয় ভুল শুধরে নেবার। যেদিন পৃথিবীর মানুষ ভিটেমাটি বিক্রি করে বোতল বোতল নিখাদ অক্সিজেন কিনবে, যেদিন গোবর পঁচা গন্ধ মেশানো মাটির বিনিময়ে কিনবে প্রযুক্তি। যেদিন থাকবে না নাগরিক কাকডাকা ভোর, থাকবে না শিশির ভেজা স্নিগ্ধ সকাল কিংবা কুয়াশার জড়ানো জোৎস্না। থাকবে একটা বুড়ো আঙুল, একটা স্মার্টফোন, একটা বোকাবাক্স। সেদিন মানুষ সভ্যতা বেচে সুখ কিনবে সেদিন আমি সিদ্ধার্থের মত জোৎসা ছড়ানো রাতে গৃহত্যাগী হবো; পাহাড়কে ভালোবেসে পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাবো।


কেন হিমালয়?

পাহাড়-পর্বতের নাম শুনলেই প্রথমেই যে শব্দটা মাথায় আসে তা হলো-‘হিমালয়’। শৈশবে যখন রূপকথার গল্প শুনতাম তার মধ্যে গল্পের প্রধান বক্তব্য থাকত রাজপুত্র চলেছে ঘোড়ায় চড়ে, হাতে খাপমুক্ত তরবারি। কত প্রান্তর, কত অরণ্য, কত নদী, এমনকি সাত সমুদ্র আর তের নদী পার হয়ে চলেছে রাক্ষসের দেশে। সেসবের মধ্যে শুনতাম না শুধু হিমালয়ের নাম। সেই রাজপুত্র সব কিছু অতিক্রম করতে পারে। পারেনা শুধু হিমালয়। হিমালয় বুঝি রূপকথারও ঊর্ধ্বে। সেজন্যই বোধ করি হিমালয় নামটা মনের মাঝে থাকত একটা উহ্য প্রশ্ন আকারে।

আমি টের পাই আমার মধ্যে আছে এক কীট। সেই কীট কেবলই খোঁজে এই হিমালয়ের পথ আর পাথর। তার বন্য প্রকৃতি কামড়ে থাকে প্রতিটি পাথরের টুকরো। সেই কীট চলে এসেছে কল্প-কল্পাতে, যুগ থেকে যুগান্তরে। আমি সেই কীট, – সেই কীটানুকীট সভ্যতার ধারাবাহিক বিবর্তনক্রমে।

হিমালয়ের মত এতোবড়, এত নিরব রণক্ষেত্র পৃথিবীর আর কোথাও নেই, কোন কালে ছিলও না। সেই এই রণক্ষেত্র রক্তপাতের নয়। এই রণক্ষেত্র ধর্মবাদের, দর্শনমতের। রক্তপাত ঘটেনি ঠিকই কিন্তু যোগতন্ত্রায় আত্মসমাহিত কত তপস্বীর জীবনপাত ঘটে গেছে এই হিমায়লয়ের প্রতিটি গুহাজুড়ে। সত্যকে যারা অক্লান্তভাবে খুঁজেছে, আলোর সন্ধানে যারা দুর্গম পথে পাড়ি জমিয়েছে, জীবনের মানে খুঁজতে যারা দারুণের পথে অগ্রসর হয়েছে, তাদের চেয়ে রণবীর কেই বা আছে? তাদের প্রশ্নোত্তর মীমাংসার পথ ধরে আমিও হেটে মরি সত্যের জগতে, আলোক সন্ধানে।


তথ্যসূত্রঃ
[১] বাংলা ইউকিপিডিয়া
[২] নিজের পায়ে নিজের পথে – ঋত্বিক কুমার ঘটক
[৩] দেবতাত্মা হিমালয় – প্রবোধকুমার সান্যাল