হিমালয়ের হেতু

হিমালয়ের হেতু

প্রতিবার হিমালয়ে যাওয়ার আগে বাসায় যখন বলি বাবা প্রতিবারই জিজ্ঞেস করেন, ‘কি দেখতে যাস এত? একই তো পাহাড়, সব একই রকম দেখতে। তার উপর এত ঠান্ডায় কষ্ট করার কি দরকার?’ আমিও বরাবরই একই উত্তর দেই, ‘তুমি এসব বুঝবা না।’ কিন্তু বের হয়ে মনে হয় বাবা হয়তো বুঝবে না কিন্তু আমি কি বুঝি যে আমি কেন যাই? কিসের নেশায়? কিসের প্রত্যাশায়? কি আছে এই রুক্ষ ভূমিজুড়ে?

কখনও প্রবল শীতে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে হাড়ে হাড়ে বাড়ি লাগার শব্দ শুনতে শুনতে, কখনও শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রায় একমাত্র আশ্রয় তাবুখানা হারিয়ে গাধা-ঘোড়ার আস্তাবলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে, কখনওবা পুড়ে যাওয়া মুখ আর মচকানো পা নিয়ে ক্রন্দন চেপে নিজ সত্বাকে জিজ্ঞেস করি- কেন? কেন এই অসীম যন্ত্রনার তীব্রতা সহ্য করা? কেন আমি এত কষ্ট সহ্য করছি? আমাকে তো কেউ জোর করেনি, কেউ বাধ্য করেনি, কেউ প্রলোভন দেখায়নি। এই নির্মম কষ্ট সহ্য করার জন্য আমি তো কিছুই পাবো না। না সম্মান, না খ্যাতি, না টাকাকড়ি। এমন কোন বড় অভিযানেও আসিনি যে ফিরলে রাতারাতি কোন তারকা বনে যাবো, বড় বড় কম্পানিগুলো স্পন্সরশীপ নিয়ে ছুটে আসবে। উপরন্তু এও জানি যে পর্বতে মানুষ সবসময় জীবনকে হাতে নিয়ে চলে। সামান্য অসর্কতা, ক্ষীণ হঠকারিতা চুড়ান্ত বিপদ টেনে নিয়ে আসতে পারে। তবুও কেন করছি এসব? আমি না হয় করছি কিন্তু পাশের স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে থাকা মানুষটা এএমএস-এ আক্রান্ত হয়ে এই মাঝরাতেও বারবার বাথরুমে দৌড়াচ্ছে কেন? সুদুর আমেরিকা থেকে ছুটে আসা মানুষটা যার নাক দিয়ে একটু আগেও রক্ত বের হয়েছে সে-ই বা কেন করছে এসব? কিংবা গতকাল রাতেও তীব্র ঝড়ে যে মেয়েটা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলেছিল ‘সোয়াইব, আমি বোধহয় মারা যাচ্ছি’ সেই মেয়েটাও আজ আরও সামনে এগোতে চাচ্ছে। কেন? কার ভরসায়? কিসের এত মোহ? কোথা থেকে আসে এই চালিকা শক্তি?

শুধু কি ওই শুভ্র-সাদা গিরিশিরা, ক্লিওপেট্রার চোখের মত নীল আকাশ, বয়ে চলা নির্ঝরিনীর মাতাল শব্দের সুধা পান করা? নাকি সৌন্দর্যকে ক্যামেরাবন্দী করে নীড়ে ফিরে এসে স্মৃতিচারণ করা? কিন্তু এও তো আজকাল ডিসকভারী, নেটজিওর মত চ্যানেলে সারাদিন দেখা যায়। না, এসব কিছুই না। আমি জানি আমি কেন করছি এসব। জানি বলেই আমার কোন আফসোস নেই, কোন যন্ত্রনা নেই, কোন অবসাদ নেই। আমি শত তীব্র যন্ত্রনাও শব্দহীন নির্বাকভাবে অবলীলায় সহ্য করে যেতে পারি। আমি জানি এই পথ চলাতেই আমার আনন্দ। আমি এই দেবতাত্মা হিমালয়ে বারবার ফিরে আসি যেই সত্তার বিপরীতে আমার বসবাস সেই সত্তার সাথে বোঝাপড়া করতে, নিজের সাথে কথা বলতে, আত্মাকে চিনতে। নিজের সহ্যসীমাকে সর্বোচ্চে নিয়ে গিয়ে নিজেকে পরখ করে দেখতে, ঝালাই করে নিতে। জীবনকে জানতে।

 

এই নীল সবুজ গ্রহটায় হিমালয় পর্বতমালাই তো একমাত্র পর্বতমালা নয়। আল্পস পর্বতমালা আছে, ককেশাস আছে, আন্দিস আছে। তাদেরও রয়েছে সুদীর্ঘ বিস্তৃতি, ব্যাপ্তি, নয়নাভিরাম শোভা। কিন্তু হিমালয়ের সতন্ত্রতা এই যে অন্যান্য পর্বতমালা শুধু পাথুরে উচ্চভূমি। কিন্তু হিমালয়ের সাথে আমরা মিশিয়েছি ধর্মকে, এই দেবভূমিতে আমরা সমর্পণ করেছি আমাদের আত্মাকে, এই পবিত্রভূমিতে আমাদের রিক্ত জীবন খুঁজে পায় পূর্ণতা। এরই ছায়ায় ধ্যানমগ্ন সহস্র মনিষীর জীবনাবসান ঘটে গেছে। এই পবিত্রভূমি লাখো বছর ধরে প্রণীকুলকে শিখিয়ে আসছে বিনয়, সহনশীলতা, উদারতা, মহত্বের মত মানবিক গুনাবলি। যে মানুষটা সমতলের নাগরিক জীবনে থাকতে রাম্তায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত কোন মানুষকেও পাশ কাটিয়ে বাসায় ফিরে গেছে সেই মানুষটাও এই দেবভূমিতে এসে করুণার আধার হয়ে যায়। একটা উদাহরণই দেয়া যাক-

পরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিন ছিলো আমাদের ট্রেকের সর্বশেষ দিন। আমাদেরকে পাড়ি দিতে হবে মোট এগারো কিলোমিটার পথ। যার মাঝে প্রথম অর্ধেক ডাউন হিল। এরপর বাকিটা আপহিল। প্রথম দিকে বেশ ভালোই আগাচ্ছিলাম। ডাউনহিলের শেষ দিকে এসে আমার দলের একজনের পা ছিলে যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে গত কয়েকদিন ধরে সেই ব্যক্তিই ফুড পয়জনিং-এ আক্রান্ত ছিল। বারবার বাথরুমে গিয়ে তাই তার শরীরও ছিল প্রচন্ড দুর্বল। ডাউনহিলে নামা তুলানামূলকভাবে সহজ তাই তখন তেমন কোন সমস্যা না হলেও আপহিলে ওঠার শুরুতেই অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলো। আরও আধাঘন্টা হাটার পর তার শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়লো যে এমন দাঁড়ালো যে তার দু’পা হাটতেই ৩-৪ মিনিট করে লাগছে। যতই উপরে উঠছি অবস্থা খারাপ হচ্ছে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। রাত নেমে আসলে এই জঙ্গলেই আটকে যেতে হবে। সাথে কোন শুকনো খাবার, এমনকি পানিও নেই। আমি জানি যে করেই হোক সন্ধ্যার মাঝে লোকালয়ে পৌঁছাতেই হবে। তবেই খাবার, পানি সব মিলবে। তাই শেষপর্যন্ত তার একহাত কাঁধে নিয়ে একরকম টেনে হিঁচড়েই তুলতে শুধু করলাম।

এমন করেই যখন একপা দুপা করে আগাচ্ছি তখন পাশ দিয়ে অন্য কোন একটা দল যাচ্ছিলো। অসুস্থ কিনা জিজ্ঞেস করার পর যখন সব খুলে বললাম তখন তাদের প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম। যার ব্যাকপ্যাকে যা কিছু ছিল এক এক করে বের করে দিতে শুধু করল। পানি, জুশ থেকে শুরু করে এনার্জি বার, বিস্কুট। এমনকি যার কাছে কিছুই ছিলো না সেও কয়েকটা চকলেট হাতে গুজে দিলো পরম মমতায়। জুশ তৈরী করে খাওয়ালো নিজের হাতে। সত্যি বলতে কি সেই অনুভূতি লিখে প্রকাশ করার মত না। অথচ হলফ করে বলতে পারি এই মানুষগুলোর মধ্যেই কেউ হয়তো শহুরে জীবনে থাকতে তিন দিনের বুভুক্ষ ভিখারীকেও খাবার না দিয়ে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু হিমালয়ের উদারতা শরীরে ধারণ করে তারা ছুটে এসেছে ভীনদেশী, বিজাতি, অপরিচিত কোন আগন্তুকের সাহায্যার্থে।

এমন ঘটনা একটাই না। বারবার ঘটেছে, বারবার দেখিছি মনুষ্যত্ব। এখানেই হিমালয়ের মহত্ব। মানুষের এই পবিত্র রূপখানা দেখতেই আমি সকল যন্ত্রনা সহ্য করে বারবার ছুটে যাই, বারবার ছুটে যেতে চাই। হিমালয়ে গিয়ে শিখরে পৌঁছাতে না, এই প্রকৃতি, এই মানুষগুলোর সাথে এই পথ চলাতেই আমার আনন্দ।

 

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *