মৃত্যু সম্পর্কে আমার অবস্থান পরিষ্কার

‘মৃত্যু সম্পর্কে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার’-শিরোনামে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যক শাহাদুজ্জামানের একটি ছোট গল্প রয়েছে। গল্পের বক্তব্য এমন- গল্পের চরিত্র পলাশের বাবা মৃত্যুশয্যায়। তাকে রাখা হয়েছে আইসিইউ-তে, লাইফ সাপোর্টে। চেতনা বলতে পলাশ প্রতিদিন বাবার কানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, বাবা আমি পলাশ, চিনতে পারছেন। মৃত্যুপথযাত্রী বাবা সামান্য ঘাড় নাড়েন। এইটুকুই। ডাক্তার বলতে পারছেন না তিনি বাঁচবেন কিনা। বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর এই ঘাড় নাড়াটুকুর মূল্য প্রতিদিন চল্লিশ হাজার টাকা। এভাবে হয়ত সে এক সপ্তাহ সার্ভাইভ করতে পারেন। আবার এক মাসও সার্ভাইভ করতে পারেন। প্রতিদিনকার এই বিপুল অঙ্কের টাকার যোগান দিতে দিতে পলাশ হয়তো নিঃস্ব হয়ে যাবে। কিন্তু দ্বায়িত্ববোধ, সামাজিকতা, নৈতিকতা আর মায়ার জাল ছিঁড়ে সে বের হতে পারে না। তার মনে পড়ে যায় বাবার সাথে তার ছেলেবেলার কথা। সেসব তাকে স্মৃতিকাতর করে দেয়। তাই সে বাধ্য হয়েই এই নিঃস্ব হবার পথ ধরেছে।

কাকতালীয়ভাবে গল্পটি পড়ছিলাম হাসপাতালে বসে বসে। আমি জানতামও না বইয়ে এমন একটি গল্প রয়েছে। জানলে বইটা বোধহয় তখন পড়তামও না। কারণ আমার বড় চাচ্চুও তখন লাইফ সাপোর্টে। যদিও তিনি তার কয়েকদিন পরেই মারা গিয়েছেন। কিন্তু বইটি পড়ার কিছুক্ষণ আগেও আমি ভাবছিলাম এই মানুষটা যদি মারা যায় তবে সাথে করে একটা পরিবারকেও হত্যা করে যাবেন। কারণ তার হাসপাতালের খরচ মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে তার পরিবার। হাসপাতালে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার টাকা। এরপর ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সেটা ষাটের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে। এভাবে এক মাস থাকা মানে পরিবারটির কাঁধে পনের-বিশ লাখ টাকার একটা বোঝা। তার উপর আমাদের সবার প্রতিদিনকার এই গৌণ কষ্ট তো রয়েছেই।

ছোটবেলায় যখন বাবা বা আম্মু কেউ বকতো বা মারতো আমার খুব অভিমান হতো। ইচ্ছে হতো মরে যাই। তখন তারা বুঝবে। আমার জন্য কাঁদবে। ইচ্ছেটা বড়বেলায় এসেও রয়ে গিয়েছিলো। কখনো কখনো মনে হতো আমার খুব বড় ধরনের একটা কঠিন অসুখ করুক। হুট করে একদিন মরে যাবো। সবাই আমার জন্যে কান্না করবে, সবাইকে যেন চমকে দিতে চাই। আহা! প্রিয়জনের চোখে নিজের জন্যে অশ্রু দেখার কতো আনন্দ। আমি জানি আমার মতো আরো অনেকেরই এই ধরনের উদ্ভট ইচ্ছা জন্মে মাঝে মাঝে। ধরুন সেই রোগটা একদিন হয়েই গেল। এরপর মৃত্যু যতোই ঘনিয়ে আসছে, বাড়ছে তার বেঁচে থাকার জন্যে আকুলতা। আরও কয়টাদিন থাকার জন্যে আর্তনাদ। অনেকসময় বাতাসেই সেই আর্তনাদ মিলিয়ে যায়। কিন্তু আজকাল আমার এই ইচ্ছেটা আর হয় না।

আমার আজকাল মনে হয় আমার এমন কোন কঠিন অসুখ হলে আমি বরং আত্মহত্যা করবো। এই নীল সবুজ গ্রহটায় আমার প্রিয় মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আমার চলে যাওয়ার বেদনায় তাদের একদিন না একদিন আচ্ছন্ন হতেই হবে। প্রাকৃতিকভাবে তাদের সেই যন্ত্রনাটা সহ্য করতেই হবে। কিন্তু আমি কোনভাবেই চাই না আমার ধুকে ধুকে মরতে মরতে তারা সেই যন্ত্রনাটা প্রতিদিন ভোগ করুক। এতোটা নিষ্ঠুর আমি কোনভাবেই হতে পারবো না। এটাকে অনেকে মনে করতে পারে আমার হতাশাগ্রস্থ অনুর্বর মস্তিষ্কের কিছু কল্পনাপ্রসূত এলোমেলো চিন্তা। কিন্তু আমি আমার ধারণার ব্যাপারে যথেষ্ট দৃঢ়, অনড়।

শেষ দিনটাতে আমার হয়ত অনেক কিছুই মনে হবে। হয়ত ভীষণ রকমের শোকাহত হবো আমি। মুখে ফুটবে মৃত নদীর মতো সূর্যাস্ত। কত কথা ছিলো বলবার। কত স্বপ্ন, কত শ্লোগান-স্বাধীনতা। কদম বা কৃষ্ণচূড়া, কিংবা একটি নীল পাহাড়। কত কিছু দেখবার ছিলো। এই গ্রহটার তো কিছুই দেখতে পারলাম না। কিছুই জানতে পারলাম না। সেই যে ছোট্টবেলায় একটা পাহাড়ের ছবি আঁকতাম। সেই নীল পাহাড়টার চূঁড়ায়ও কোনদিন ওঠা হলো না। কিম্বা জনমানবহীন গভীর অরণ্যের মাঝে তাবুতে শুয়ে শুয়ে ঝড় দেখাও হলো না আর। কত আফসোস! কত না পাওয়া! কিন্তু এসব শোকই আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে। কারণ মৃত্যু সম্পর্কে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার। কারণ আর একটা দিন জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া মানে আরও একটা দিন প্রিয় মানুষগুলোকে বেদনার সমুদ্রে নিমজ্জিত করা যার কোন অধিকার আমার নেই।

আমার এই ছোট্ট জীবনে বেশকিছু মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে দেখার সুযোগ হয়েছে যাদের বেশিরভাগই কঠিন অসুখে ধুকে ধুকে মরেছেন। তাদেরকে দেখেছি কি নিদারুন কষ্টের মধ্যে প্রতিটা দিন অতিবাহিত করেছেন। আমি সবসময়েই বুঝতে চেষ্টা করি তাদের এতো জীবনীশক্তি কোথা থেকে আসে। এতো যন্ত্রনা সহ্য করছে ঠিক কি কারনে? নিজের মৃত্যুকালটা আর কয়েকটা মিনিট, কয়েকটা ঘন্টা কিংবা কয়েকটা দিন দীর্ঘায়িত করার জন্যই কি শুধু? তখনও কি তাদের জীবনের কোন অর্থ থাকে? তবুও বেঁচে থাকার এ করুণ আকুতি কেন? অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার তাড়না? ঠিক কি কারণে সেটা আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি।

আত্মহত্যা কোন সমাধান নয় বলছে কেউ কেউ, আবার ভিন্নমত অন্যপক্ষের- সবারই নিজ নিজ মৃত্যু গ্রহনের অধিকার থাকা উচিত। আমরা নিজের ইচ্ছেতে পৃথিবীতে আসি না। কিন্তু চলে যাওয়ার অধিকারটা অন্তত নিজেদের দেয়া উচিত। ধর্ম, সমাজ সবসময়েই আত্মহত্যার বিপরীতে। কিন্তু কিছু কিছু সমাজব্যবস্থা এখনও রয়েছে যেখানে প্রতিটি মানুষকে কার নিজ মৃত্যু গ্রহনের অধিকার দেয়া হয়েছে। যেমন সুইজারল্যান্ডে ‘ডিগনিটি’ নামক একটি সংস্থা রয়েছে। ইউরোপীয় আইনের বদৌলতে তারা সেচ্ছায় আপনাকে আত্মহত্যার অধিকার প্রদান করবে। তাই নয়; তারা আপনার ইচ্ছায় আপনাকে হত্যাও করবে। এমন আরও অনেক সংস্থা হয়েছে। কিন্তু তাদের ধার্যকৃত অর্থের পরিমান বিপুল। কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা ১১ হাজার ইউরো পর্যন্ত। এই ভবঘুরে জীবনে এতো বিপুল পরিমান অর্থ যে আমার কখনোই জমবে না সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। কিন্তু সেচ্ছায় মৃত্যু গ্রহনের অধিকার আমারও থাকা উচিত।

অনেকেই মনে করেন পৃথিবীতে তার কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে যার কারণে তার আরও কয়েকটা দিন, কয়েকটা মাস অন্তত বেঁচে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের প্রত্যেকেই কিছু নির্দিষ্ট কাজ নিয়ে এই পার্থিব জগতে এসেছি। আমৃত্যু সেই কাজ করে যাওয়াতেই জীবনের সার্থকতা। সমস্ত জীবনজুড়ে সে সত্যের অন্বেষন আমি করে বেড়িয়েছি, সব কিছুই যেখানে আপেক্ষিক, মৃত্যুই সেখানে ধ্রুব সত্য। যে জীবনের অর্থ খুঁজতে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কখনও হিমালয়ের দুর্গম গিরিকন্দরে ছুটে গিয়েছি, সেই পথে শুধুই মনে হয়েছে আমাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে সত্যান্বেষণ। মৃত্যুর মত একটা অমোঘ সত্যকে মেনে নিতে কেন আমাদের এত কষ্ট তা আমি বুঝতে পারি না। এই চরম সত্যকে যখন মেনে নিতেই হবে তবে বিড়ম্বনা কিসের?

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *