বাবাঃবিপন্ন বিষ্ময়

বাবাঃবিপন্ন বিষ্ময়

বাবা নিয়ে কোটি কোটি উপমা দেয়া যায়, পাওয়া যায় হাজার কোটি পরিচয়। কিন্তু আমার বাবা আমার কাছে একটি ‘বিপন্ন বিষ্ময়’। যে বিষ্ময়ের সন্ধান জীবনানন্দ পেয়েছিলেন ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতায়। বাবা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যে পরিবারের মধ্যমণি হয়েও অস্তিত্বের গভীরে বোধ করেন বিপন্নতা, যাকে প্রতিনিয়ত বইতে হয় অপ্রতিরোধ্য ক্লান্তির ভার। যদিও মানুষমাত্রই এই বিপন্নতা, এই ক্লান্তির অংশীদার নয়। কেউ কেউ এই দুর্বহ নিয়তির ভাগিদার হয়। সেই নিয়তির দায় মেটাতে গিয়েই অর্থহীন পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হয়। সেই ‘কেউ কেউ’ই হয় বাবা। তারপরেও যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের বাবা নামক প্রাণীটির সাথে তার আর কখনোই সাক্ষাৎ হয়ে ওঠে না।

ছোটবেলায় সামান্য আবদার পুরণ না হলেও বাবাকে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ লোকের তালিকায় কতোবার ফেলেছি তার ইয়ত্তা নেই। আর যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি তাঁর গুরুত্ব সেদিন থেকেই তাঁর প্রত্যাশা পুরন করতে না পারায় বহুবার নিজেকে দাঁড় করিয়েছি কাঠগড়ায়। কিন্তু আমার কাছে বাবার চাহিদা খুব কম। তখন সবেমাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছি।  উচ্চতর গনিতের আগামাথা কিছু বুঝতে পারছি না। ফলস্বরূপ অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষায় প্রায় ফেল করে বসলাম। টেনেটুনে মোট নম্বর পেয়েছি একচল্লিশ। ক্লাসের সেকেন্ড বয়ের এমন ফলাফল দেখে স্যার নালিশ করে বসলেন বাবার কাছে – “আপনার ছেলে ম্যাথে মাত্র একচল্লিশ পেয়েছে। এই রেজাল্ট নিয়ে তো এসএসসি পাশও করতে পারবে না। কি করবে জীবনে জিজ্ঞেস করেন।” বাবা বলেছিলেন, “আমার ছেলে পাশ করতে পারবে কিনা জানি না। কিন্তু আপনারা ওকে একটু ভালোভাবে পড়ান যাতে করে ও ফেল করে হলেও একটু মানুষ হতে পারে।” হ্যাঁ এইটুকুই; আমার কাছে বাবার চাহিদা এইটুকুই- “একটু মানুষ হতে হবে”।  “একটু মানুষ” হতে পেরেছি কিনা জানি না তবে বার্ষিক পরীক্ষায় ম্যাথে ৭৫ এর মধ্যে ৭৩ পেয়ে ক্লাসের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলাম। কিন্তু ঐ “একটু মানুষ” হতে না পারার ব্যর্থতায়, আত্মগ্লানিতে প্রায়শই নিজেকে নিয়ে দাঁড় করাই কাঠগড়ায়।

এই আত্মগ্লানির পেছনে আরও অনেক কারণ থেকে যায়। আমরা সন্তানরা বেশিরভাগই মা ঘেঁষা হয়ে থাকি। যত আবদার সবকিছু থাকে মাকে ঘিরেই। কোন কিছু দরকার হলে  বাবার সঙ্গে কেমন যেন একটা দূরত্ব থাকে। মায়েরা সন্তানকে নিয়ে সংসার নামক সংসদে ঐক্যজোট গঠন করে। বাবা দেখে তাঁর সন্তানেরাও তাঁর পক্ষে নেই। কিন্তু তাঁরা কখনও জানতেও পারে না তাঁদের সন্তানেরা নীরবে তাঁদের নিয়ে কতটা গর্ববোধ করে, কতটা ভালোবাসে। ভালোবাসি শব্দটাও সন্তানের মুখ থেকে কখনও শুনতে পান না তাঁরা। সেই ছোটবেলা থেকে এখনও যখন যা কিছুর দরকার পড়ে আবদারগুলো সব গিয়ে জমে মায়ের তহবিলে। সেটা আম্মু গিয়ে বলবে বাবাকে। এরপর প্রাপ্তি। মাঝে মাঝে তো বাবা বলেও ফেলেন- “তোমার ছেলের কি লাগবে তা সরাসরি আমাকে কেন বলেনা?” কারণটা দূরত্ব কিংবা ভয়ের নয়। কারণটা সংকোচের। ছোটবেলায় কেন চাইতাম না মনে নেই। কিন্তু বুঝতে শেখার পর থেকে চাইতে পারিনা তাঁর রক্ত জল করা অর্থে নিজের ভোগ বিলাসে খরচ করার সংকোচে।

আমার মত বাবার ভালোবাসাগুলোও থাকে নীরব; তার কোন বাহ্যিক প্রকাশ থাকে না। কিছুদিন আগে বাসায় অতিথি থাকার কারণে রাতে আমার থাকার সঙ্কুলান হলো বাবার সাথে। আম্মু পাশের রুমে। ভোর রাতের দিকে আমার প্রচন্ড জ্বর আসলো। শীতে কাঁপছি। পাশের ঘুমুচ্ছে বাবা। সে টেরও পাচ্ছে না। কয়েকবার মৃদু কন্ঠে ডাকার পরেও সাড়া না পেয়ে চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। ওই সময়টাতে পাশে আম্মু শুয়ে থাকলে আমার সামান্য গোঙনিতেই এক লাফে উঠে বসত। মাথায় জলপট্টি দিয়ে বাকিটা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিতো। এর মানে এই নয় সে একজনের ভালোবাসা অন্যজনের থেকে প্রবল। শুধু দুইজনের ভালোবাসার ধরনটা আলাদা। একজনের ভালোবাসা মাথার উপর শীতল জলপট্টি দেয়, অন্যজনের ভালোবাসা মাথার উপরে বটবৃক্ষের ন্যায়- যে বটগাছ ছায়া দেয় রোদের সময়, বৃষ্টির সময় বৃষ্টির ফোঁটার হাত থেকে বাঁচায়, রাতের বেলা আকাশের তারা গোনা হইয় যে বটগাছের ছায়ায় বসে। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে উভয়েরই প্রয়োজন হয়। শুধুমাত্র একজন হারিয়ে গেলেই বোঝা যায় মাথার উপরে কিছু একটা না থাকার যন্ত্রনা কতটা।

বাবা বেশ শক্ত ধরনের মানুষ। তাঁকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। যতবারই যত বড় সমস্যা নিয়েই তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছি, ততবারই চেরাগের দৈত্যের মত এসে সব সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ঘটনা। যেই সময়টায় জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভেসে যাচ্ছিলাম, পুরো দুনিয়া মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, সবাই বলতে শুরু করেছিলো “তোমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবেনা” সেই সময়টাতে একমাত্র এই মানুষটাই দিশারী হয়ে টেনে তুলেছিলেন, পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর মত অপটিমিস্টিক মানুষ দ্বিতীয়টি আর দেখিনি। বজ্রের মত কঠিন এই মানুষটির চোখে কোনদিন জলও দেখিনি সেই বৃষ্টির সন্ধ্যাটা ছাড়া। তন্দ্রাগ্রস্থ, রক্তাক্ত আমাকে মেঝে থেকে তুলে চোখে জল নিয়ে কাতর কন্ঠে যে বলেছিলেন “তুই এমন করলে আমাদের কি হবে?” এই একটা বাক্যই আমার পুরো জীবনটাকে আমূল বদলে দিয়েছে। সেদিন ঐ বাক্যটি না শুনলে বোধহয় তীরহারা অকূলেই ভেসে যেতাম। এখন তীরের কতটা কাছাকাছি আছি জানিনা কিন্তু সেই দু’ফোটা জলের ঋণ আমি আজও শোধ করতে পারিনি।

বাবার সাথে এমন হাজারও সুখের-দুঃখের গল্প রয়েছে যা লিখবো বলেই শুরু করেছিলাম কিন্তু লিখতে গিয়ে অদ্ভুত রকম শব্দহীনতায় ভুগছি। কিছু গল্প অন্তরে বিষের কাটা ফোটাচ্ছে কিন্তু লেখার মত শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না, কিছু গল্প লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে থাকুক না এগুলো একান্ত পিতা-পুত্রের ব্যক্তিগত। রাতে ঘুমের মাঝে বাবাকে মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি। আধপাকা দাঁড়ি, কুঞ্চিত হয়ে ঝুলে যাওয়া চামড়ায় মুখায়বে বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। ধড়ফড় করে উঠে বসি। ইচ্ছে হয় ফোন করি। ফোন করে ‘বাবা, বাবা, বাবা, বাবা’ বলে রেখে দেই। কিন্তু আমি পারিনা।

আজ বাবা দিবস। ‘ঘটা করে বাবা দিবস পালনের কি দরকার?’ এই প্রশ্ন অনেকের। কিন্তু আমার মনে হয়, থাক না একটা দিন অন্তত তাঁর জন্যে! এই একদিনও যদি পৃথিবীর অনেক বাবা তাঁর সন্তানকে কাছে পায় কিংবা ভালোবাসি কথাটা শুনতে পায় ক্ষতি কি? এমন দিনে আমারও ইচ্ছে হয় একটা উপহার হাতে তাঁর সামনে দাঁড়াতে। বিশেষ দিবসগুলোতে উপহার দেয়ার সাথে আমি অভ্যস্ত নই। তবে খুব দেখতে ইচ্ছে হয় উপহার হাতে নেয়ার পর বাবার অনুভূতি। হঠাৎ করে ছেলের হাতে উপহার পেয়ে হয়তোবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে, হয়তোবা মুচকি হাসির আড়ালে শক্ত মানুষটাও কেঁদে ফেলবে। বাবার সাথে আমার দুরত্ব অনেক। বরাবরের মত বাবা দিবসে ভালোবাসি কথাটাও আমার বলা হবেনা। গত ৭ বছর ধরে এই দিনটাতে বাবার সামনে যাই শুধু বলার জন্য,”বাবা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তাঁর সামনে গিয়ে নিশ্চুপই থেকে যাই। বাবাও মনে হয় বুঝতে পারে আমার বলেতে না পারাটা। চিন্তা করো না বাবা, একদিন ঠিকই “একটু মানুষ” হবো।


ছড়িয়ে দিন

4 thoughts on “বাবাঃবিপন্ন বিষ্ময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *