প্রযত্নে অবন্তিকা

প্রযত্নে অবন্তিকা

বসুন্ধরা, ঢাকা

১লা বৈশাখ, ১৪২৬

প্রিয় অবন্তীকা,

তোর মনে হতে পারে প্রিয় বলে প্রথমেই ভুল করে ফেললাম। যে মানুষ নিজের সন্তানকে গর্ভে নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে, সে আর যাই হোক প্রিয় হতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তুই সেই প্রিয় স্থানটিই দখন করে বসে আছিস। কারণ আর কেউ না জানুক আমি তো জানি জীবনের কি করুণ পরিহাস তোকে সেই নরককুণ্ডে নিয়ে ফেলেছিলো। তাইতো বিশ্বাস করি তুই আত্মহত্যা করিসনি, তোকে খুন করা হয়েছে। আর তোর খুনীদের তালিকা করতে দিলে আমি নিজের নামটাও সেই তালিকায় রাখতে চাই। হ্যাঁ, আমিও তোকে খুন করেছি। খুন করেছি সেদিন যেদিন তুই বলেছিলি, ‘অভ্র, তুই কি কখনো আমাকে ভালোবেসেছিস?’ মিথ্যার ধারালো ছুরি দিয়ে আমি খুন করেছিলাম তোকে। আমি বলতে পারিনি কোনদিনই, যেমনটা পারিসনি তুই।

তারপর বাবা-মায়ের সেই ‘মেয়ে সুখে থাকবে’ গোঁড়ামির শিকার হয়ে, মিথ্যে বাহানায় বিয়ের পিড়িতে বসলি অচেনা বরের কনে হয়ে। বাসর রাত নামে যে রোমাঞ্চের কথা সারা জীবন ভেবে এসেছেলি তার বদলে দেখলি সেখানে মঞ্চস্থ হচ্ছে একটা ধর্ষণ চিত্রের। বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এই কষ্ট সহ্য করার জন্যে কিন্তু বাহবাও পেলি না কখনোই। কারণ তোর সবটাই যে ছিল সবার অজানা। যতো যাই হোক সেই রাতে তোর মনে মনে চরম স্বামীভক্তিই দেখা দেবে বলে মনে করেছিলাম। নববধুর খামচে ধরা বিছানাটাই শুধু নজরে পড়বে কুমারিত্ব হরনের নেশায় ব্যস্ত বরের, গড়িয়ে পড়া তোর কয়েক ফোঁটা জল তার অদেখাই থেকে যাবে তার। তোর চোখের সেই জলেই গোপনে ভেসে যাবে পুরোনো সব স্মৃতি। ভেবেছিলাম আরেকটু জোরে বরকে আকড়ে ধরে পাকাপোক্ত করে নিবি নতুন আশ্রয়। পরদিন থেকে আরেকটা নতুন সংসার, নতুন বাবা-মা সামলে রাখার দায়িত্বটাও ভালোভাবেই বুঝে নিবি। কিছুদিন হয়ত সবকিছু মানিয়ে নেবার চেষ্টাও করেছিলি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরে গেলি? নাকি আমাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য নিজেকে বিসর্জন দিলি?

দেখ্তো, তোর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি লিখতে গিয়ে কি সব আবোল-তাবোল লিখছি। কিন্তু কি করব বল? তোর মৃত্যুর পর থেকে প্রতিটা পহেলা বৈশাখই যে আসে তীব্র বিষাদ নিয়ে। তোর কি মনে পড়ে তোর সাথে পরিচয়ের পর প্রথম জন্মদিনের কথা? তখন ২০১৪ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্ত। চারিদিকে উত্তেজনা। তুই আমি দু’জনেই ব্রাজিলের সমর্থক। উপহারের কথা জিজ্ঞেস করায় বলেছিলি, ‘অভ্র, আমাকে একটা মার্সেলোর জার্সি দিবি? আর তুই নিবি নেইমারের। আমি রক্ষণভাগ দেখবো আর তুই আক্রমন ভাগ।’ তুই চলে যাওয়ার পরে আমার রক্ষনভাগটা যে বড় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। প্রতি পদক্ষপে প্রতিপক্ষের আক্রমনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে জীবনের গোলপোষ্ট।

প্রতিটা মানুষের মনের একটা নিজস্ব বারান্দা থাকে। সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে প্রতিদিনকার জীবনের হিসেব মেলায়, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তুই কি জানতি যে তুই ছিলি সেই বারান্দাটুকু যা হারিয়ে আমি এই দরজা কপাটহীন দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে গিয়েছি। এর থেকে আমার আর কোন নিস্তার নেই। কিংবা বলতে হয় তুই ছিলি একটি জানালা। একটা বদ্ধ ঘরের মধ্যে জানালা দিয়ে যেভাবে আলোকরশ্মি প্রবেশ করে ঘরটাকে আলোকিত করে রাখে তেমনি তোর মাধ্যমেই জীবনের শুদ্ধতম অনুভূতিগুলো আমার মনের বদ্ধ ঘরটাতে প্রবেশ করে আমার আত্মাটাকে উজ্জল করে তুলতো। তুইতো ছিলি সেই মানুষটা যে আমার আত্মাটাকে দেখতে পারতিস, দেখতে পারতিস আমার ভয়, আমার ভঙ্গুরতাগুলোকে।

শাহবাগের অগ্নি ঝরা দিনগুলোতে গড়ে ওঠা তোর আর আমার বন্ধুত্ব শাহবাগের আন্দোলনের মতই মিইঁয়ে গিয়েছে তোর আত্মহননে, নীরব প্রস্থানে। কি করে পেরেছিলি তুই? মৃত্যুর আগে ঠিক কেমনটা লেগেছিলো তোর? প্রিয় সবকিছু, প্রিয় মুখগুলো কি তোর চোখের সামনে ভেসে ওঠেনি? সেখানি কি আমি ছিলাম? আমায় দেখেছিলি কখনও? অনুভব করেছিলি? আমি টের পাই তুই চলে যাওয়ার পর আমি কেমন যেন হয়ে গিয়েছি। কেমনজানি অনুভূতিশূণ্য। কোন কিছুই যেন আমাকে আর স্পর্শ করতে পারে না। ভালোবাসার ক্ষমতাটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। চাইলেও আমি কাউকে ভালোবাসতে পারি না, মায়া জন্মে না। কি যে অসহ্য যন্ত্রনা এ এক! একটা মানুষ এক সপ্তাহের মত বেঁচে থাকতে পারে পানি ছাড়া, দুই সপ্তাহ খাদ্য ছাড়া, অনেক বছর কোন বাসস্থান ছাড়াই; কিন্তু একাকীত্ব? এটা যে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম যন্ত্রনা।

মরে গিয়ে ভালোই করেছিস একদিক থেকে। যে মানুষটার দুইটা কিডনীই নষ্ট ছিলো সে তো চলে যেতোই। নিজেই যখন শারীরিক অসুস্থতার কাছে পরাজয় স্বীকার না করে বেছে নিলি অন্তিম স্খলনের যাত্রা তখন সে যাত্রাকে শুভকামনা তো জানাতেই হয়। কিন্তু তবুও এই নীল সবুজ গ্রহটাকে আরও কিছুদিন উপভোগ করার অধিকার তো তোরও ছিলো। কোন রূপকথার দানো এসে যে সবকিছু তছনছ করে দিলো! জানিসতো, কাউকে হাসতে দেখলেই আমরা বলি মানুষটা অনেক সুখী। আবার কাঁদতে দেখলেই নীরবে বুঝে যাই তার মনে কতো দুঃখ লুকানো। কিন্তু এর বাইরেও কিছু জিনিস থাকে। যেমন- ব্যাথা। এটা কখনোই খালি চোখে দেখা যায় না, এক্সরে করলেও ধরা পড়ে না, ধরলেও টের পাওয়া না যতক্ষন না সে প্রকাশ করছে তার ব্যাথা করছে । সেটা গায়ের ব্যাথা হোক কিংবা মনের ব্যাথা হোক। তোর সেই ব্যথাটাকেই কেউ বুঝতে পারলো না এই অন্ন ও যৌনতা ভরা দুনিয়াতে।

তোকে বলার জন্য কত কথা যে জমে আছে! কত চিঠি, কত ডায়েরীর পাতা ভর্তি হয়ে আছে। তারচেয়ে বরং কিছু অপ্রিয় সত্য কথাই বলি- একটা সময় যাকে ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচবো না ভেবেছি আজ তাকে ছাড়াই দিব্যি ভাল মানুষের মত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মনের সুখে একের পর এক সিগারেট ফুঁকছি। আড্ডা মারছি। সুন্দরী মেয়ে দেখে শিষ দিচ্ছি। সব কিছুই এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তোকে লেখা শেষ চিঠিটাও মানিব্যাগের কোনায় পড়ে আছে অনেক দিন। এক বার খুলে পড়ারও সময় হয় না। তোর যে বান্ধবীটা সারা দিন তোর সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো তাকে কয়েকদিন আগে রাস্তায় দেখলাম। ওর নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। তাই আর ডাক দিতে পারি নি। শোন্ আমি ভাল আছি। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড নেশায় বুদ হলে চোখ গড়িয়ে জল পড়ে শুধু। কিন্তু এ জল সত্যিকারের জল না। এ জলেও ভেজাল আছে। তাও চোখজোড়া বুঝতে চায় না। আমিও যেমনটা বুঝতে চাইতাম না। তুই যা বলেছিলি ঠিকই বলেছিলি। সময়ে মানুষ সব ভুলে যায়। ভালবাসা মনের গভীরে ঘুমিয়ে যায় নিশ্চিন্তে, নীরবে। তারপরেও, মানুষ যখন দূরে চলে যায় সম্পর্ক গুলোর কী হয় তখন? মানুষ হারাতে পারে সম্পর্কও কী হারায়? কোথাও না কোথাও তো সেগুলো ঠিকই বেঁচে থাকে। শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট সময় পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সময়টা বড় বেইমান। আমার থেকে, তোর থেকেও।

ইতি-
অভ্র


 

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *