পাগল!

পাগল

সকাল ৯ টা বাজে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। আমি তখন সাজেকে রিলাক্স মুডে চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছি। হঠাৎ করেই পরিচিত একজন ফোন দিয়ে হাউমাউ করে বলল আমাকে নিয়ে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছে। সে দেখেছে আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি এবং পাগলের মত আচরণ করছি। হাউমাউ করার কারণ আমাকে নিয়ে সে ২০১৫ সালে একটা স্বপ্ন দেখেছিল যেটা নাকি ২০১৭ সালে সত্যি হয়েছে। তার মানে আমি ২০১৯ সালে পাগল হয়ে যাবো এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলেই ধরে নিয়েছে। তার হাউমাউ করার কারণ বুঝলাম না কিন্তু আমি বেশ খুশিই হয়েছি। পাগলদের নিয়ে আমার আগ্রহের কোন কমতি কখনোই ছিল না। এমনকি আমি বেশ কয়েকমাস ধরে এ নিয়ে পড়াশুনাও করেছি।

প্রথমেই যে জিনিসটা মাথায় আসবে তা হলো একটা মানুষকে পাগল কখন বলা হবে? সাধারণ মানুষ ও পাগলদের আলাদা করার মানদন্ডটা কি? মানসিকভাবে অসুস্থ কিভাবে বলতে পারি? একটা সাধারণ মানুষ যেভাবে চিন্তা করে সেভাবে চিন্তা না করলেই কি তাকে পাগল বা যায়?

মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে জটিলতম জিনিস। এই মস্তিষ্কের কাজকারবারও বড়ই বিদঘুটে। পৃথিবীতে প্রথম যখন প্রাণের অস্তিত্ব আসে তখন তাদের কোন মস্তিষ্ক ছিলো না। প্রথম মস্তিষ্কের খোঁজ পাওয়া যায় সরীসৃপের মাঝে। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের পূর্ণ বিকাশ হয়নি। তাদের ছিল রেপ্টাইল ব্রেইন, যাতে চিন্তাশীল কোন অংশ ছিলো না। এটা ব্রেইন মূলত খাদ্য অন্বেশন, সেক্সুয়াল এক্টিভিটি এসবেই মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই রেপ্টাইল ব্রেইন এখনও আমাদের মাঝে রয়ে গেছে। এরপর যখন স্তন্যপায়ী আসলো তখন এদের রেপ্টাইল অংশ ফুলে একটা নতুন অংশ সৃ্ষ্টি করল যা লিম্বিক সিস্টেম নামেই আমরা জানি। এই অংশটি আমাদের অনুভূতি নিয়ন্ত্রন করে। কিন্তু আমাদের চিন্তাশক্তি নিয়ন্ত্রন করে যে অংশটি সেটি হলো নিও কর্টেক্স। এই অংশটিই আমাদের সৃজনশীল কাজ করতে সাহায্য করে।

দেখা গেছে আমাদের প্রিমিটিভ ব্রেইন বা রেপ্টাইল ও লিম্বিক সিস্টেম প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬ বিলিয়ন নার্ভ সিগন্যাল ফায়ার করে যেখানে নিও কর্টেক্স করতে পারে মাত্র শ’খানেক। তুলনামূলক দূর্বল সংযোগের কারণে আমাদের নিও কর্টেক্সের ইমপালস আমাদের প্রিমিটিভ ব্রেইনের ইমপালসে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। এই নার্ভ সিগন্যালগুলো আবার প্রসেস হয় মস্তিষ্কে অনেক গভীরে, হাইপোথ্যালমাসে। এই সিগন্যালগুলো বিভিন্ন নিউরো ট্রান্সমিটার দিয়ে পাস হয়। যা নিয়ন্ত্রন করে মোটর আর সেন্সরি।

আমাদের মস্তিষ্কে একটি বিশাল বড় ডেটাবেইজও আছে। আমাদের কাছে থাকা বর্তমান টেকনোলজি যেমন ওরাকল, এসকিউএল সার্ভার, ম্যাঙ্গো ডিবির মত জায়ান্ট ডেটাবেস দিয়েও যার তুলনা করা চলে না। জন্ম থেকে আমাদের সাথে ঘটে আসা বিভিন্ন ঘটনা ও সেসব ঘটনায় আমাদের রিএকশনগুলো অবজেক্ট আকারে এই ডেটাবেজেই রো আর কলামে বিন্যস্ত থাকে। রিএকশন ও একশনের এসব ঘটনার মধ্যকার রিলেশন ইন্টারকানেক্টেড রাখার জন্য বিভিন্ন ওয়ান টু ওয়ান, মেনি টু ওয়ান, মেনি টু মেনি রিলেশনশিপের মাধ্যমে স্টোরেজড থাকে। কখনও বা ইনহেরিটেঢ হয়েও থাকে। যখন কোন ঘটনা যা ইতিপূর্বে আমাদের সাথে ঘটেনি অর্থাৎ আমাদের মস্কিষ্কের ডেটাবেজে নেই তেমন কোন দৃশ্য চোখে দেখলে আমরা সেই দৃশ্যের অনুরূপ কোন অবজেক্ট আমাদের ডেটাবেজে কুয়েরী করে পাই না। তখনই আমাদের মাঝে আলৌকিক চিন্তা ভাবনার উদয় হয়।

এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আর এই সব কাজ তখনই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে যখন আমাদের হাইপোথ্যালমাস থেকে ক্ষরিত হরমোন যেমন থাইরোট্রপিন, ডোপামিন, ভ্যাসোপ্রেসিন ইত্যাদি ব্যালেন্সড অবস্থায় থাকে। যখনই এসব হরমোন ইমব্যালেন্সড হয়ে পড়ে তখন কিছু নিউরন ড্যামেজ হয়ে পড়ে। ফলে নিউরো ট্রান্সমিশন ব্যহত হয়। আর যাদের ক্ষেত্রে এসব ঘটে তাদেরকেই আমরা পাগল বলি।

কিন্তু নিউরো ট্রান্সমিশনে ঝামেলা থাকলেই তাদের পাগল বলা হবে কিসের ভিত্তিতে? অনেক সময় দেখা গেছে এই ইমব্যালেন্স যাদের মধ্যে থাকে তারা তুখোড় মেধাবী হয়ে থাকে, সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক সময় এদের আইকিউ অসম্ভব রকমের বেশি হয়, অনেক ক্ষেত্রেই তারা এক্সট্রা অর্ডিনারি হয়ে থাকে। তাই আমার মনে হয় পাগল বলে কিছু নাই। এটা একটা ফেনোমেনন মাত্র।

 – ২৬ অক্টোবর, ২০১৭ 

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *