অদ্ভুত এক শিহরন, কাব্যিক এক অনুভূতি, অজানা এ পথ চলা। আর কত? কত দূরে কল্পনাতে আঁকা প্রেয়সীর মুখ? আর কত অপরিসীম এই প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হবে? আর কত প্রহর কাটালে কানপেতে শুনতে পাবো হিমালয়ের কান্না? শিশিরজলে পা ভিজিয়ে চলতে শুরু করব রক্তিম সূর্যের দিকে। বিনিদ্র রাতে শুয়ে শুয়ে মুগ্ধ হয়ে জোসনা মাখা শুভ্র হিমালয়কে দেখব। আচ্ছা সেই জোসনা রাতে কি বৃষ্টি হতে পারে না? বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হবে ঝড়ে পড়া জোসনা। আকাশ সাজাবে হাজারো নক্ষত্র। যে আকাশকে ভালোবেসেই পাহাড়ের বেড়ে ওঠা। জানিনা সামনের পথে কি অপেক্ষা করছে। আপাতত কল্পনাতেই আমার বসত।

ঘুম স্টেশনের সৌন্দর্য্য এতোটাই বিমুগ্ধ করেছে সে সামনের অনাগত অজানা রূপকথার কল্পনাতে ভাসতে শুরু করেছি জীপে উঠেই। জিপ চলছে তার নিজস্ব গতিতে। সেদিকে আমার মন নেই। জানালার পাশের সিটে বসে বসে মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুড়ি দেখছি। পাহাড়ের সৌন্দর্য্য বোধহয় খুব বেশিক্ষণ দেখতে নেই। তাই মেঘ তার রূপের পসরায় ঘোমটা তুলে দেয় বার বার। দূর থেকে দেখা মেঘ এতোটা কাছ থেকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা একটা সুন্দর গ্রহ। পাহাড়ের বুকে সুর্যাস্তের দৃশ্য দেখলে হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে।
ঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজে
(পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে)

একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্যপাশে দার্জিলিং শহরকে নিয়ে চলেছি। ঘুম থেকে সুখিয়া পোখারি খুব বেশী দূরে নয়। ১৫-২০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম সুখিয়া পোখারি। জীপের ড্রাইভার আমাদের গাইডের কাজও করে দিচ্ছে।কোনটা কি সবকিছু চিনিয়ে দিচ্ছে। ‘পোখারি’ নেপালি শব্দ। এর মানে যে ‘জলাশয়’ সেটাও ড্রাইভারের কাছ থেকেই জানা। সুখিয়া পোখারি থেকে থেকে মোড় নিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে বামে। এই রাস্তা ধরেই মিরিক ঘুরে শিলিগুড়ি পৌঁছানো যায়। অন্যটা সোজা। এটাই এখন আমাদের পথ। বেশ নির্জন রাস্তা। খুব বেশী মানুষের পদচারনা নেই এই পথে। সেজন্য রাস্তাটাও বেশ সুন্দর, সরু- সাপের মত।

পাহাড়ের সূর্যাস্ত হয় বেশ আগেই। শেষ মূহুর্তে সমস্ত পাহাড়ের চুড়োজুড়ে লালচে আভা ছড়িয়ে হঠাৎ টুপ করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। পাহাড়ের বুকে টিপ টিপ করে জ্বলে ওঠে কমলা হলুদ বাতির সারি আর নিরিব নিস্তব্ধতা। আমাদের জীপ এগিয়ে চলেছে সেই আবছা অন্ধকার ভেধ করেই। মানেভাঞ্জনে প্রবেশের মুখেই একটা চেকপোষ্ট। ভেবেছিলাম এখনা থেকেই বোধহয় চেকিং এর ঝামেলা শুরু হবে। কিন্তু না, তেমন কিছুই না। আমাদের ড্রাইভার ছোট্ট একটা সালাম দিয়েই ভিতরে ঢুকে পড়ল। আমার আগে থেকেই প্লান করা ছিলো জীবন চিত্রের “হোটেল এক্সোটিকা”য় ওঠার। এর পেছনে অবশ্য বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ জীবন দা এখানকার রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক আর একজন সান্দাকফু এন্সাইক্লোপিডিয়া। রাতে খাবার পর তার সাথে গল্প করতে পারাটাও এই ভ্রমনের একটি অন্যতম অভিজ্ঞতা। এছাড়াও সে বাঙালী। নিজ ভাষা ছাড়া গল্পটা ঠিক জমে না।
আমরা যখন মানেভাঞ্জন পৌছাই তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা ৭ টা। এর মধ্যেই প্রায় বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। ড্রাইভারকে জীবন চিত্রের কথা বলতেই এক নামে চিনে গেলো। নামিয়ে দিলো তার হোটেলের সামনেই। সান্দাকফু ট্রেকের মূল ফটোক যেখান থেকে শেরু হয় তার ঠিক পাশেই জীবনদার হোটেল। দোতলা একটা বিল্ডিং এর পাশ দিয়ে সরু এক সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। সামনেই লেখা ‘রিসিপশন উপরে’। উপরে উঠে নিজেদের পরিচয় দিয়ে ঘরের ব্যবস্থা করলাম। অফ সিজন হলেও দোতালায় ডরমেটরীর ১২টি বিছানা ছাড়া আর কিছুই খালি নেই। ঘুরতে এসে থাকা খাওয়া নিয়ে এতো চিন্তা খুতখুতে হলে চলবেঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজে না। ওই ১২ টি বিছানার ৬ টি দখল করে রাতের খাবারের কথা বলে নিচে চলে আসলাম নিজেদের প্রয়োজনীয় টুকটাক কেনাকাটার উদ্দেশ্যে।
আমার সব ভ্রমনেই বৃষ্টি উঠকো ঝামেলা পাকাবেই। তাই বৃষ্টি নিয়ে আমার সবসময়েই বাড়োতি ভয়। তাও রেইনকোট আনিনি বাড়তি বোঝা টানতে হবে তাই। কিন্তু কাশিয়ং এ বৃষ্টির যে রূপ দেখলাম আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। তাই সবার জন্য দেড় মিটার করে পলিথিন কিনে নিলাম প্রথমেই। এখানকার বেশীরভাগ দোকানই বাসার মত। নিজেদের বাসার একপাশে বাড়োতি আয়ের জন্য দোকান খুলে বসেছে প্রায় প্রতিটি পরিবারই। কিছু দরকারি ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল, পেইন কিলার না নিলেই নয়। তৌফিক ভাই মেডিকেলে পড়ে শেষবর্ষে। তাই সে দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম তৌফিক ভাইয়ের উপর। বাকি কেনাকাটা যা যার নিজের মত করে সেরে নিলাম; শুকনো খাবার হিসেবে বিস্কুট, শরীর গরম রাখতে বাদাম, কফি।
শেষ খাবার খেয়েছিলাম শিলিগুড়িতে। সারাদিনের উত্তেজনায় সে সব কারো মাথায়ই ছিলো না। আর এখন খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। ততক্ষণে সব বন্ধ হয়ে গেছে। একটি মাত্র দোকান খোলা আছে। “হোটেল কাঞ্চনজঙ্ঘা”র নিচের সেই রেস্টুরেন্টেই মমো আর নুডুলস দিয়ে পেটপুজো করে যখন নিজেদের হোটেলে ফিরে এলাম তখন ঘড়ির কাটা রাত সাড়ে আটটা ছুঁই ছুঁই করছে।
হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে চেষ্টা করছি বাংলাদেশে যোগাযোগের। কিন্তু কোনভাবেই নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলছে না। কোনমতে ২ মিনিটের মাঝে বাসায় আম্মুকে ফোন করে সবকিছু ঠিক আছে জানাতেই নেটওয়ার্ক চলে গেল। ইতিমধ্যে মানেভাঞ্জনে নেমে এসেছে শুনসান নিরবতা। পুরো মানেভাঞ্জনই ঘুমিয়ে পড়েছে এর মধ্যেই। দেশে থাকতে তো রাত ২ টার আগে ঘুমানোই হয় না। এখন এখানে এতো দীর্ঘ রাত কি করে কাটবে ভাবতে ভাবতে রুমের সামনের দরজা খুলে বারান্দায় আসতেই সে চিন্তা কেটে গিয়ে মুখ হা হয়ে গেলো। সামনের দিগন্তে যতদূর চোখ যায় সবটুকু জুড়ে রয়েছে মিটি মিটি আলো। পাহাড়ের ঢালের এই সৌন্দর্য্য প্রকাশ করতে রীতিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে এখন। স্বপ্নও বোধহয় এর থেকে কম সুন্দর হয়। অন্ধকারের দেয়াল বেয়ে যে জোসনা বারাব্দায় আছড়ে পড়ছে এর দিকে চোখ দিয়ে শুধু একটি রাত নয়, বরং হাজার বছর কাটিয়ে দেয়া যায়। অতৃপ্ত অনুভূতিগুলকে অচেতন করে দেয়ার মত দৃশ্য।
ঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজে
(মানেভাঞ্জনের রাত)

কতক্ষণ মুগ্ধ নয়েনে তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই। সম্বিৎ ফিরে আসল জীবনদার ডাকে। খেতে ডাকছেন। কিছুক্ষণ আগেই নিচ থেকে খেয়ে আসায় খুব বেশী খিদেও নেই। কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে পড়বে। এরপরে কেউ আর খাবার গরম করে দিতে পারবে না। অগত্যা এই সৌন্দর্যের মায়া ছেড়ে আপাতত খেতেই যেতে হলো। খাবার মেনু খুব আহামরি কিছু না। ভাত, সবজি, ডাল আর পাপড়। খাবার পরে বসলাম জীবনদার সাথে গল্প করতে। গল্পের এক পর্যায়ে জানালেন কিছুদিন আগেই তারাও বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশের কোথায় এসেছিলেন জিজ্ঞেস করতেই জানালেন ইন্দেরহাট, স্বরূপকাঠি। এবার আমার আকাশ থেকে পড়ার জোগাড়। কোন জেলা না, বিভাগ না, সরাসরি আমার গ্রামের নাম। তাও এই পরবাসে এসে। তাদের মুখে নিজ গ্রামের খেয়াঘাটের নাম পর্যন্ত শুনেও রীতমত অবাক হতেই হয়।

জীবনদা আর তার স্ত্রীর সাথে গল্প আর ট্রেকিং পরিকল্পনা শেষে আবার সেই বারান্দায় ফিরে গেলাম। প্রেমমাতাল জোসনা। এমন জোসনার প্রেমে পড়েই সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী হয়ে যাবো হয়ত একদিন। সকল কল্পনার অবসান ঘটে এখানে। ক্যামেরা হাতে প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের ‘চাঁদিনীতে’ বেরিয়ে আসছে শীতের কাঁপা গলায় –
“বেবিলোন কোথা হারায়ে গিয়েছে-মিশর-অসুর কুয়াশাকালো;/ চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক, মেঘের পালকে ঢালিছে আলো! /সে যে জানে কত পাথারের কথা, কত ভাঙা হাট মাঠের স্মৃতি! /কত যুগ কত যুগান্তরের সে ছিল জোছনা, শুক্লা তিথি! /হয়তো সেদিনও আমাদেরই মতো পিলুবারোয়ার বাঁশিটি নিয়া /ঘাসের ফরাশে বসিত এমনি দূর পরদেশী প্রিয় ও প্রিয়া!”
যাহা সুন্দর তাহাই কেন ভয়ংকর? হাজার বছর বোধহয় আর বসে থাকতে দিবে না এই নিষ্ঠুর শীতের কাঁপুনি। ঠান্ডায় পুরো জমে গেছি। দিগন্তের পাহাড়ের বাতিগুলোও কমে গেছে অনেকটা। নিভে আসছে ধীরে ধীরে। রুমে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে পরদিনের স্বপ্ন যাত্রার স্বপ্ন দেখতে দেখতে আর ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। কাটিয়ে দিলাম জয়িতার খোঁজের আরও একটি দিন, কাঞ্চনজঙ্ঘা মায়ায় আরও একটি রাত।
ছড়িয়ে দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।