গতকাল দুপুর থেকে চলছি তো চলছিই। এক মুহূর্ত থামার অবকাশ এখন পর্যন্ত মেলেনি। মাঝে পেরিয়ে এসেছি দীর্ঘ পথ। উদ্দেশ্য সেই পাহাড় আর মেঘ ছুয়ে যাবার স্বপ্ন। এক নতুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে যাচ্ছি। দাঁড়িয়ে আছি সীমানা ঘেঁষে। শিলিগুড়ি হিলকার্ট রোড থেকেই মূলত দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটকগামী জীপগুলোর সারি শুরু হয়। ইচ্ছে তো করছে এখনই জীপে চড়ে বসি। এক নিঃশ্বাসে পৌছে যাবো রূপের রানী, প্রিয়তমা দার্জিলিং এর কোলে। কিন্তু ব্যাকপ্যাক কাঁধে হাটুজোড়া বলছে, “ওরে পাগল, প্রিয়তমার কোলে গিয়ে বসে থাকলেই হবে? আর যে জন্য আসলি সেই জয়িতার কি হবে? গতকাল থেকে অনেক জ্বালিয়ে মেরেছিস, এখন যদি দু দন্ড বিশ্রাম না দিস তবে আকাশ ছোঁয়া পাহাড় ডিঙবো কি করে রে?” সুযোগ পেয়ে পেট বাবাজিও কথা শোনাতে ছাড়লো না। কি আর করার! অগ্যতা হোটেল খুঁজতে নামতে হলো প্রিয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে।
ঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজেজীপ নামিয়ে দিয়েছিলো হিলকার্ট রোডের ট্রাফিক সিগন্যালের মোড়ে। আসার আগে খুব ভালো করে ম্যাপে দেখে এসেছি এখান থেকে হাতের ডানে ইউটার্ন নিয়ে যে রাস্তাটা সেবক রোডের দিকে গিয়েছে এই রাস্তায় হোটেলের অভাব নেই। কিন্তু হোটেল থাকলেই তো চলবে না, আমার মত বাজেট ট্রাভেলারের সাধ্যের মধ্যেও তো সেটা থাকতে হবে। হাটছি ফুটপাত দিয়ে, দু’পাশের সাইনবোর্ড গুলোতে চোখ রেখে। কিন্তু কোনটাতেই ঢুকতে সাহস হচ্ছে না। আমি তো হিন্দী বুঝিও না, বলতেও পারি না। হোটেলের ম্যানেজার কি না কি বলে দিবে কিছুই বুঝব না। তাছাড়া মেইন রোডের পাশের এসব হোটেলে বোধহয় গলা কেটে দাম রাখবে। না বাবা, আমি বরং একটু ভেতরের গলির দিকে খোঁজাখুজি করি। একাকী দূরদেশে এসে মনের মাঝে ক্ষাণিক ভয়, একটু শঙ্কা আর অনেকখানি উদ্যম নিয়ে হাটছি আর এসব সাত-পাঁচ ভাবছি। ভাবতে ভাবতে কখন যে এক হোটেলে ঢুকে গেছি খেয়ালই নেই। ঘোর কাটলো ম্যানেজারের কথায়, “কিতনে আদমী?” এই যাহ! এ তো দেখছি হিন্দী বলছে। এর মানে কি? কত দামী রুম চাইছি সেটা নাকি কত দিন থাকব। এই হিন্দী আমার পোষাবে না। “নো থ্যাক ইউ” বলে দিলাম উলটো হাটা।
কিছুটা সামনে এগোতেই কাঁধে ব্যাগ দেখেই বোধহয় এক হোটেল থেকে ডাক দিলো, তাও পরিষ্কার বাংলায়। কিছুটা ভরসা পেয়ে গেলাম। রুম দেখালো, সবকিছুই ঠিক আছে। কিন্তু ওই যে আমার মত বাজেট ট্রাভেলারের জন্য নয় এসব। এমন করে সেবক মোড়ে প্রায় ৪০ মিনিটের মত খোজাখুজির পরে ‘হোটেল রত্না’য় ঠাঁই মিললো। রত্না নাম দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম বাংলা হোটেল, গিয়ে দেখি নেপালি। যদিও হোটেল মালিক বাংলা বোঝেন। কিন্তু তার আর দরকার হলো না। এবার দেখি আমার সহযাত্রী সাইরাজ ঝরঝর করে হিন্দীতে কথা বলছে তার সাথে। যাক কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেলো। বিপদে-আপদে এই সহযাত্রী রক্ষা করতে পারবে। বেশ কিছুক্ষণ দামাদামি করে ৬০০ টাকায় ৩ জনের জন্য বেশ বড়সড় একটা রুমের ব্যবস্থা করা গেল।
আমাদের রুমে পৌঁছে দিয়ে গেলো যে আয়া সে আবার বাংলাদেশী। কিন্তু এখন ইন্ডিয়ার নাগরিক। দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো পরিবারের হাত ধরে কোনরকম পাসপোর্ট-ভিসার ধার না ধরেই। ফলশ্রুতিতে এখন আর দেশে ফেরা হচ্ছে না তার। ঘুরতে গিয়ে সেখানকার মানুষের সাথে গল্প করা, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা আমার চিরাচরত অভ্যাস। গল্প জুড়ে ঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজেদিলাম তার সাথে। খুব ছোটবেলায় বাবা-মা এর সাথে এদেশে এসেছিলেন জীবিকার খোঁজে। বসতি গড়েছিলেন দার্জিংলিং এর এর ছোট্ট ঘরে। দাদাও ছিল তার একজন। বেশ কয়েক বছর আগে চুরি করে বর্ডার পারি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে গিয়ে বিএসএফ এর গুলিতে মারা যায়। কি নির্মম সমাজব্যবস্থা। এক কাঁটাতারের প্রাচীর তোলা অনিক্ষেত প্রান্তর সৃষ্টি করে তথাকথিত সার্বভৌমত্ব রক্ষার নির্মম প্রচেষ্টা। বাবা-মা মারা যাবার পর বিয়ে করে এখানেই এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “দেশে ফিরতে ইচ্ছা করে না?” বেচারী হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ফুঁপিইয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলো, “দেশে যেতে কার না ইচ্ছা করে। প্রতিদিনই ইচ্ছা করে। কিন্তু পাসপোর্ট নাই। পুলিশ যেতে দিবে না। গুলি করে মেরে ফেলবে।” বললাম, “পাসপোর্ট করে নিলেই তো পারেন?” অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। এরপর বলল, “পাসপোর্ট? সে তো অনেক টাকা লাগে। অত টাকা কোথায় পাবো।” এখান থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় এই মানুষগুলো কতটা দরিদ্র সীমার নিচে বাস করছে। স্বভাবতই কিছুটা দয়া জন্মে গেলো তার উপর। যার তিক্ত ফলাফল পেয়েছিলাম পরদিনই।
থাকার যেহেতু একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলো এবার একটু ফ্রেশ হয়ে পেটপুজো করা যাবে চিন্তা করে হোটেলের সেই দিদিকে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করতেই খুশিতে গদগদ হয়ে হয়ে জানালো সে নিজেই এনে দিতে পারবে। ভাত, মুরগী, সবজি সব মিলিয়ে ১৪০ রুপি। তবে আমরা মানে ট্যুরিস্টরা গেলে নাকি ঠকিয়ে বেশী রেখে দিবে। একে তো নরম বিছানা দেখে জার্নির সমস্ত ক্লান্তি সারা শরীরে ভর করেছে, তা উপর বাথরুমের শরীর জুড়ানো ঠান্ডা পানির লোভ, এই অবস্থায় গিয়ে খেয়ে আসার কোন মানেই হয় না। তার চেয়ে বরং তাকেই পাঠিয়ে দিলাম আমাদের তিনজনের খাবারের জন্য।
গোসল পর্ব শেষ করতে করতে খাবার চলে এলো। ১৪০ রুপিতে তো দেখি এলাহী ব্যাপার। কেউই পুরো খাবার শেষ করতে পারিনি। অন্য সময় হলে হয়ত এতো লম্বা জার্নির পর এমন একটা জম্পেস খাওয়ার পরে লম্বা ঘুম দিতাম। এখানেও সেই উদ্দেশ্যেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু চোখের পাতা আর এক হয় না। সমস্ত দেহ-মন-প্রান জুড়ে এক উৎকন্ঠা, কোথায় যেন একটু ঝাপসা ঝাপসা দেশের জন্য টান। কখনো পিছুটান, কখনো সামনের কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি। সবমিলিয়ে ঘুম নামক বস্তুর আর দেখা মিললো না। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে শিলিগুড়ির বুকে। কি করা যায়, কোথায় যাওয়া যায় ভাবছি। পাশেই হংকং মার্কেট (স্থানীয়দের ভাষায় চোর মার্কেট), আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম, বেশকিছু মনেস্ট্রী আর টেমপেলও রয়েছে। কিন্তু কল্পনার রঙে আঁকা, হাজারবার ইন্টারনেটে ছবি দেখে দেখে যে প্রিয়তমা কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি হৃদয়পটে এঁকে রেখেছি তার কোলে মাথা রাখার আগ পর্যন্ত কোন কিছুই আর টানছে না। আর এদিকে সহযাত্রী সাইরাজ টানাটানি করছে শপিং মলের খুঁজে দিতে। জানালাম সেবক রোডের সামনের দিকে বিগ বাজার আছে। ব্যস! টানতে টানতে নিয়ে গেল বিগবাজার। খুব বেশী বড় কিছু না। আমাদের দেশের সাধারনমানের শপিংমল গুলোর মতই সিমসাম। তবে গোছানো। কেনাকাটা কিছুই হলো না শুধু ১০ টাকার ঝালমুড়ি খেয়ে ফিরে আসলাম।
ঘুমন্ত বুদ্ধের কোলে, জয়িতার খোঁজেবাংলাদেশ থেকে এক ভাইয়ের কাছ থেকে একটা ভোডাফোনের সিম নিয়ে গিয়েছিলাম। তাই সিম কেনার ঝামেলা পোহাতে হলো না। শামীম ভাই তাও নিজের জন্য একটা সিম কিনলেন। ‘ভোডাফোন থেকে বাংলাদেশে কলচার্জ ২ টাকা প্রতি মিনিট। কিন্তু সেজন্য আগে ৩৯ টাকার পাওয়ার লোড করতে হবে’, এমটাই বুঝিয়েছিলেন দোকানদার। আমিও সেই অনুযায়ী রিচার্জ করে বাসায় ফোন দিলাম। কিন্তু বিধিবাম। ১ মিনিট হতে না হতেই আমার ফোনের ব্যালেন্স ফাঁকা হয়ে ফোন কেটে গেলো। পরে জানলাম আমাদের সিমটা কলকাতা থেকে কেনা তাই দার্জিলিং জোনে কলকাতার কলরেট পাওয়া যাবে না। রাগে আর নতুন করে সিমই কিনলাম না। ভেবেছিলাম শামীম ভাই যেহেতু সিম নিয়েই নিয়েছেন তার ফোনে রিচার্জ করেই বাংলাদেশে কথা বলতে পারবো। আর সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো পরে।
হোটেলে ফিরে সানি ও রিয়াদ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। তাদের বর্ডার ছিলো হরিদাসপুর হয়ে। এরপর কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি আসছে। ফোন নাম্বার ও হোটেলের নাম ঠিকানা দিয়ে দিলাম তাদের। এরপর একটু ফেসবুকে ঢুঁ মারতেই দেখি আরেক চমক। তৌফিক ভাইয়ের আসার ইচ্ছা ছিলো প্রচন্ড। কিন্তু সে সময়ে সে হসপিটালাইজড ছিলেন। ফেসবুকে গিয়েই দেখি রিলিজ পেয়েই সেও ইন্ডিয়া চলে এসেছে। আছে মালদা তে। কাল সকালে শিলিগুড়ি পৌঁছে যাবেন। ভাবলাম বেশ। দল তাহলে শেষ পর্যন্ত ৬ জনে গিয়ে দাঁড়ালো।
সারাদিন পরে এই প্রথম চোখে পড়ল হোটেলের রুমে একটা টিভিও আছে। ওমা! ৬০০ টাকার হোটেলে দেখি টিভিও আছে। বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে টিভি দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টেরই পাইনি।
ছড়িয়ে দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।