ওম মনি পদ্মে হুম্‌

ওম মনি পদ্মে হুম

হাজার হাজার বছর ধরে হিমালয়ের উত্তর অংশে দাঁড়িয়ে আছে তিব্বত নামের রহস্যময় এক রাজ্য। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগের কথা। দুর্গম পর্বতমালা, কঠোর আবহাওয়া, তুষারের শীতলতাসহ সকল প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়ে, ক্লান্তিকর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, ভারতের বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের কালিম্পং এর দুর্গম রাস্তা ধরে ১০৪২ সালে আমাদেরই বাংলাদেশের এক কৃতি সন্তান পৌঁছালেন সেই হিমালয় দুহিতা তিব্বতে। সাথে সাথে একদল ঘোড়সওয়ার ছুটে এসে তাঁকে অভ্যার্থনা জানালো। সেই ঘোড়সওয়ারদের হাতে তীক্ষ্ণ বর্ষার মাথায় পতপত করে উড়ছে শ্বেত পতাকা, সুরতোলা বাদ্যযন্ত্রে বাজছে স্বাগত বাজনা আর সেই সাথে উচ্চারিত হচ্ছে পবিত্র মন্ত্র-‘ওম মনি পদ্মে হুম ’।

Atisha
দ্য মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টস-এ সংরক্ষিত আনুমানিক ১১০০ খ্রীষ্টাব্দের অতীশ দীপঙ্করে প্রতিকৃতি

তিব্বতের গু-জে-এর রাজা স্বয়ং গার্ড অব অনার দিয়ে বরণ করেছিলেন বাংলার এই জ্ঞানতাপসকে, নাম তাঁর শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। অতীশ দীপঙ্করের জন্ম বাংলার বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে। তাঁকে ’11th century Tibetan Buddhist master’ বা ‘একাদশ শতাব্দীর তিবেতান বুদ্ধগুরু’ বলা হয়। এবং Oṃ maṇi padme hūṃ (ওম মানি পদ্মে হুম) মন্ত্রটি বাংলার বজ্রযানী তান্ত্রিক বৌদ্ধদের মন্ত্র হলেও বর্হিবিশ্বে এই মন্ত্রকে তিবেটান (তিব্বতের) মন্ত্র হিসেবে জানে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ শতক থেকে ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ-এই ৮০০ বছর ধরে তৎকালীন বাংলায় আর্য ভাবধারা বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে বাংলায় ধীরে ধীরে বৌদ্ধ সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কালক্রমে এই সভ্যতা দুইটি মূলধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি ‘মহাযান ‘ এবং অন্যটি ‘হীনযান ‘। ‘মহাযান ‘ অর্থ- ‘মহৎ মার্গ ‘ অর্থাৎ যে মহৎ পথে যান বা শকট চলে সেই পথ। মহাযানীরা মনে করেন প্রতিটি মানুষের ভিতরেই বুদ্ধ বিদ্যমান। সে বুদ্ধত্ব অর্জন করতে হলে দরকার সাধনা ও জ্ঞানের, প্রজ্ঞার। যে ব্যক্তি বুদ্ধ নির্দেশিত নির্বাণে উপনীত হতে এবং বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী, সে যে মহৎমার্গ বা উপায় অবলম্বন করে তারই নাম ‘মহাযান’। হীনযানীরা বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী নয়, তারা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের এবং তপস্যার মাধ্যমে নির্বান লাভে আগ্রহী । এ জন্য মহাযানীরা এ মতকে হীন মনে করে। দুটি সম্প্রদায়ের বিভক্তির এটিই মূল কারণ।

৫২০ খ্রীষ্টাব্দে গুপ্ত যুগের পতনের পরে ভারতবর্ষে ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বেশ অবনতি ঘটেছিল । এ প্রসঙ্গে সুনীল চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন-

‘গুপ্তযুগের সমাপ্তির পর থেকে সমবেদী মায়াবিদ্যা ও যৌনঅতীন্দ্রিয়বাদের আদিম ধারণা ভারতীয় ধর্মে পরিব্যপ্ত হয়েছিল’ (প্রাচীন ভারতের ইতিহাস। দ্বিতীয় খন্ড পৃষ্ঠা; ১৪০)

এই আদিম বা আর্যপূর্ব ধারণা বৌদ্ধমতকেও প্রভাবিত করেছিল। এর ফলে অষ্টম শতকে বাংলা ও বিহারে (মগধে) মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম পরিবর্তিত হয়ে ‘বজ্রযান’ নামে একটি মতবাদ গড়ে ওঠে। বিক্রমপুর বা বিহারের বিক্রমশীলা মঠটি ছিল বজ্রযানী বৌদ্ধদের অন্যতম সাধনমার্গ। একাদশ শতকে এই মঠের বজ্রপন্থিগন তিব্বতে ধর্ম প্রচার করতে গিয়েছিলেন। তাদেরই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। এই বজ্রযানেরই প্রধান মন্ত্র হল: ‘ওম মনি পদ্মে হুম ‘। যার শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় “মনিই প্রকৃত পদ্ম“। কিন্তু এই মন্ত্রের মাঝেই লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ বজ্রযান তথা বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা।

Chenrezigthangka
অবলোকিতেশ্বর | ছবিঃ উইকিপিডিয়া

‘ওম মানি পদ্মে হুম ‘ ছয়টি শব্দাংশের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্কৃত মন্ত্র যা বৌদ্ধ সভ্যতার চার হাতওয়ালা ছায়া দেবতা ‘অবলোকিতেশ্ব ‘-এর এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। অবলোকিতেশ্বর হলেন বোধিসত্ত্বগণের অন্যতম মধ্যে যিনি সকল বোধিসত্ত্বের মধ্যে প্রকাশমান করুণার আধার। মূলধারার মহাযান বৌদ্ধধর্মে ইনিই হলেন সর্বাধিক পূজিত বোধিসত্ত্ব এবং সর্বাপেক্ষা অধিক সমাদৃত। অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যতক্ষণ এই পৃথিবীতে একটিও প্রাণী বদ্ধ থাকবে ততক্ষণ তিনি নির্বাণলাভ করবেন না। অবলোকিতেশ্বর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন তিব্বতি ভাষায় তাঁর নাম ‘চেনরেজ়িগ ‘। তিনি হাতে পদ্ম ধারণ করে থাকেন বলে কখনও পদ্মপাণি  হিসেবেও অভিহিত হন। আবার তিনি লোকেশ্বর  অর্থাৎ জগতের প্রভু নামেও পরিচিত। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মানুসারে অবলোকিতেশ্বর দলাই লামা, এবং কারমাপা রূপে জীবকুলের মঙ্গলার্থ এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন।

বজ্রযানীগণ বিশ্বাস করতেন দেবদেবীদের করূণা ভিক্ষা করে লাভ নেই। এদের বাধ্য করতে হবে। যে গ্রন্থে এই বাধ্য করার উপায় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে তাকে বলা হইয় ‘তন্ত্র ‘মন্ত্র  এবং যন্ত্র -এ দুই হল বজ্রযানের সাধনার উপকরণ। যে কারণে বজ্রযান কে বলা হয় ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ‘। আর ‘যন্ত্র ‘ হল ‘মোহিনী প্রতীক ‘, যা সঠিক ভাবে আঁকতে হয়। মোহিনী প্রতীক হল ‘Religious Symbolism’ যা মার্কিন লেখক ড্যান ব্রাউন আধুনিক পাঠকের কাছে অনেকাংশে পরিচিত করে তুলেছেন। আর পদ্মকে বৌদ্ধধর্মে বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বজ্রযানীদের প্রধানা দেবী হলেন তারা । ইনি ছিলেন বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বদের স্ত্রী। মাতঙ্গী, পিশাচী, ডাকিনী, যোগীনি প্রমূখ তুচ্ছ দেবীও বজ্রযানীদের আরাধ্য ছিল। ‘ওম মনিপদ্মে হুম ‘ মন্ত্রটি বুদ্ধ এবং প্রজ্ঞাপারমিতার এবং বোধিসত্ত্ব এবং তারা দেবীর যৌনমিলনের প্রতীক।

Tara_thangka
অষ্টাদশ শতাব্দীতে চিত্রিত রুবিন মিউজিয়াম অফ আর্টস-এ সংরক্ষিত ‘তারা দেবী

মহাযানীপন্থার অন্যতমা দেবী ছিলেন প্রজ্ঞাপারমিতা। মহাযানীরা বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী এবং বোধিসত্ত্ব মতবাদে বিশ্বাসী। বোধিসত্ত হচ্ছেন তিনি যিনি বারবার জন্মগ্রহন করেন এবং অপরের পাপ ও দুঃখভার গ্রহন করে তাদের আর্তি দূর করেন। মহাযানীপন্থায় যে কয়েকজন বোধিসত্ত্ব রয়েছেন। এঁদের মধ্যে পূর্বে উল্লেখিত অবলোকিতেশ্বর, মঞ্জুশ্রী এবং বজ্রপানি প্রধান। প্রজ্ঞাপারমিতা কে বোধিসত্ত্বেরই গুণাবালীর মূর্ত রূপ বলে মনে করা হত। বোধিসত্ত্বদের স্ত্রী কল্পনা করা হয়েছিল। এই দেবীই ছিলেন দেবতাদের প্রকৃত শক্তি। দেবতাকে মনে করা হত সদূর এবং অজ্ঞেয় এবং দেবীকে সক্রিয় মনে করা হত। মহাযানীরা বিশ্বাস করতেন যে দেবতাকে পেতে হলে দেবীর সাহায্য নিতে হয়। সৃষ্টিকে ভাবা হত যৌনমিলনের প্রতীক। কাজেই কোনও কোনও মহাযানী সম্প্রদায়ে যৌনমিলন ধর্মীয় আচারে পরিণত হয়েছিল। এই যৌনবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মরমী অতীন্দ্রিয়বাদ।

সে যাই হোক, ‘ওম মানি পদ্মে হুম’ মন্ত্রটিকেই বুদ্ধ ধর্মের সকল শিক্ষার বীজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ‘Oṃ’ ‘ma’ ‘ṇi’ ‘pad’ ‘me’ ‘hūṃ’ এই ছয়টি শব্দাংশের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রটির প্রতিটি শব্দাংশ আলাদা আলাদা শিক্ষা প্রদান করে। শব্দগুলো সাধারনত কিছু পবিত্র পাথর যা ‘মনি পাথর’ নামে অভিহিত করা হয় তার গায়ে খোদাই করা থাকে। অথবা কাগজ বা কাপড়ে লিখে প্রার্থনা চক্রে (প্রেয়ার হুইল) লাগানো থাকে। এই মন্ত্রটি চক্রে একবার ঘোরানো হলে এরপর যতবার ঘুরতে থাকে ততবারই মন্ত্রটি উচ্চারিত হয় বলে ধারনা করা হয়। শব্দগুলোকে বিভিন্ন বৌদ্ধ স্কুল নানা ভাবে অনুবাদ করে থাকে। অনেক লেখকই মনে করেন যে ‘মনিপদ্ম’ একটি যৌগিক শব্দ। সংস্কৃতে কোন বড় হাতের অক্ষর না থাকায় মন্ত্রটি অনুবাদ করতে গিয়ে বড় ও ছোট হাতের অক্ষর জনিত কারণে এর ভাবার্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়। মন্ত্রকে অনুসারীরা নানাভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। এমনকি শব্দগুলো একটি নিছক সিকোয়েন্সের মতো যার প্রভাবগুলো কঠোর অর্থের বাইরে চলে যায়।

মাঝের শব্দদ্বয় (‘মনিপদ্ম’)কে একত্রে ‘পদ্মের রত্ম’ বা ইংরেজীতে ‘লোটাস ইন দ্য জিয়েল’ বলা হয়। সংস্কৃতে ‘মনি’ কে কখনও কখনও দেবী চিন্তামণির সাথেও তুলনা করা হয়ে থাকে; যা পদ্ম ফুলের মাঝে তাঁর অবস্থানকে নির্দেশ করে। কিন্তু ডোনাল্ড লোপেজের মতে,

এটি আসলে অধিকরন বা স্থানসূচক কিছুকে নির্দেশ করে না। বরং এটি একটি উচ্চারনগত পার্থক্য যা বৌদ্ধসভ্যতার দেবতা অবলোকিতেশ্বর এর একটি উপাধিকে নির্দেশ করে। এটি পূর্বে ‘ওম’ ও পরে ‘হুম’ শব্দের মাঝে অবস্থিত যা ভাষাগত অর্থ ছাড়াই ব্যাবহৃত হচ্ছে।

লোপেজ আরও বলেন যে অধিকাংশ তিব্বতি বৌদ্ধ গ্রন্থে মন্ত্রকে অনুবাদ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন- চেংরিগ সাধনায় এই ছয়টি শব্দ ছয়টি রাজ্যের অস্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে।

পদ্মফুল বিশুদ্ধতার প্রতীক। সুতরাং ‘প্রকৃত পদ্ম’; মানে ‘প্রকৃত বিশুদ্ধতা’ হতে পারে। তাহলে ‘মনি’ শব্দটি কি অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? বলা হয় যে, এই মন্ত্রের মধ্যেই বুদ্ধের শিক্ষা রয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বুদ্ধ প্রকৃতি বিদ্যমান। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বিশুদ্ধতার বীজ রয়েছে, এটার উন্নয়ন সাধন করে বুদ্ধত্বে রূপান্তরিত করতে হবে। আমাদের সাধারণ দেহ, বাক্য ও মন বিশুদ্ধ হয়ে রূপান্তরিত হবে বুদ্ধের পবিত্র দেহে, বাক্যে ও মনে। আর ‘ওম মনিপদ্মে হুম’ সেই পথটির অনুশীলন করে যা কিনা পদ্ধতি (মেথড) ও প্রজ্ঞা (উইজডম) এর অবিভাজ্য সংযুক্তি। এই মন্ত্রের পথ ধরেই আমরা আমাদের অশুদ্ধ দেহ, বাক্য, এবং মনকে রূপান্তর করতে পারি একজন বুদ্ধের মহিমান্বিত দেহ, বাক্য, এবং মনে।

স্বামী শিভানন্দ বলেছেন,

ওম (আউম) হলো সব। ‘ওম’ হলো ইশ্বর ও ব্রহ্মার নাম ও প্রতীক। ওম হলো সত্যিকারের নাম। ওম মানবের ত্রিগুণিত অভিজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। ওম হলো বাহ্যিক জগৎসমূহ। ওম থেকে জ্ঞান-মহাবিশ্ব অভিক্ষিপ্ত হয়েছে। মহাবিশ্ব টিকে আছে ‘ওম’ এর উপর আবার বিলিনও হবে ‘ওম’-এ।  

ওম (ওস্ বা অউম) শব্দটিকে বিচ্ছেদ করলে আমরা পাই। এখানে ‘অ’ ‘বিষ্ণু’, ‘উ’ ‘মহেশ্বর শিব’ ও ‘ম্’ ‘ব্রহ্ম’ কে নির্দেশ করে। একে মনে করা হয় সকল মন্ত্রের আদিবীজ। সামবেদের শব্দ অবয়বের প্রথম অবয়ব। ভাগবতে এই বীজের উৎপত্তি । পরমেষ্ঠ আত্মসংযম করার পর, তাঁর হৃদয়াকাশ হতে এই শব্দ উৎপন্ন হয়েছিল । হৃদয়াকাশে আত্মার নিকট হতে এর উৎপত্তি । এটি নিজের আশ্রয় ও সাক্ষাৎ ব্রহ্মবাচক; সৰ্ব্বমন্ত্র ও উপনিষৎ স্বরূপ । এটিই বেদের সনাতন বীজ।
‘অ’ শারীরিক সমতলকে প্রতিনিধিত্ব করে। ‘উ’ মানসিক এবং নাক্ষত্রিক সমতল, বুদ্ধিমান আত্মার জগৎ, সকল স্বর্গ। ‘ম’ গভীর ঘুমের দশা-কে প্রতিনিধিত্ব করে, এমনকি সকল কিছু যা কিনা জাগ্রত অবস্থায়ও অজানা, এবং সেইসব কিছু যা কিনা আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির নাগালেরও বাইরে। এইভাবে ‘ওম’ ই সব আমাদের জীবন, চিন্তন ও বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি। সমগ্র বিশ্বজগত ‘ওম’ থেকে উদ্ভুত, ‘ওম’এ অবস্থিত এবং ‘ওম’ এই বিলীন হবে।

‘মনি’ শব্দের অর্থ রত্ন, ফসিল(বীজকোষ)। বিশুদ্ধ রত্ন হলো ভালোবাসা ও দয়ার প্রতীক। এবং তা জ্ঞানদীপ্ত হওয়ার বাসনাকে প্রতীকী রূপ দান করে। ‘মনি’ হলো ‘মায়া’, ‘বাসনা’, ‘সংসার’ও ‘নির্বান’ এর উদ্ভব।

‘পদ্মে’ মানে কমল যা কিনা প্রজ্ঞার, জ্ঞানের উদ্দীপনার প্রতীক। একটি পদ্মফুল যেমন পংক থেকে ওঠে তেমনি প্রজ্ঞাকে মানব অবস্থা থেকে স্বর্গীয় গুন অর্জন করা পর্যন্ত পৌছাতে হবে। সকল প্রজ্ঞার মূল প্রজ্ঞা হলো ‘নীরবতা ও শূণ্যতার প্রজ্ঞা’। ‘পদ্মে’ মানে শূণ্যতা (এমটিনেস)।

Astasahasrika_Prajnaparamita_Bodhisattva_Helping
বোধিসত্ত্বাকে সাহায্যরত অবলোকিতেশ্বরের চিত্রকর্মটি মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টস-এ তৈরীকৃত। | সূত্রঃ দ্য সান

‘হুম’ প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতির সংযুক্তি ঘটায়। এটা অবিভাজ্যতা, স্থবিরতা, যাকে আন্দোলিত করা যায়না। এটা জ্ঞানদীপনের মনন কে উপস্থাপন করে। ‘হুম’ যন্ত্রণাকে ধ্বংস করে।

বৌদ্ধ শাস্ত্রে কখনও একে এভাবেও দেখা হয়ে থাকে–’ওম মনিপদ্মে হ্রং’ অর্থাৎ দেবকুলে(ওম), অমরকুলে(ম), মানুষরূপে(নি), পশুরূপে(প), হতাশরুপে(দ্মে), নারকিরূপে(হুম বা হ্রং) —পুনৰ্জ্জন্ম নিরোধ করে । এই মতানুসারে পুনর্জন্মের ছয় অবস্থাস্বচক ছয় বর্ণ উক্ত ছয় অক্ষরে আরোপিত হয়ে থাকে। আবার কখনও একে বৌদ্ধ শাস্ত্রের আত্মায় ছয়টি পরিশোধনের নির্দেশক হিসেবে ভাবা হয়। এই ছয়টি পরিশোধন হলো- গৌরব বা অংহ (ওম), ঈর্ষা বা কাম (মা), আবেগ বা আকাঙ্খা (নি), অজ্ঞতা বা কুসংস্কার (প), লোভ (দ্মে), ঘৃণা (হুম)। কখনও একে বৌদ্ধ ধর্মের ছয়টি রঙের নির্দেশক হিসেবে কল্পনা করা হয়- সাদা (ওম), সবুজ (ম), হলুদ(নি), নীল (প), লাল (দ্মে), কালো(হুম)। এখানে কালো মূলত বাকি পাঁচটি রঙের সমন্বয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কখনও মহাযানীদের ছয় পারমিতাকে এই ছয়টি শব্দাংশ দ্বারা নির্দেশিত করা হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। এই ছয় পারমিতা হল- দান(ওম), শীল(ম), ক্ষান্তি(নি), র্বীয(প), ধ্যান(দ্মে) ও প্রজ্ঞা (হুম)। এই ছয় পারমিতার মধ্যে প্রজ্ঞা পরিমিতাকে মূখ্য রুপে দেখা হয়েছে। প্রজ্ঞা পারমিতার মৌলিক অর্থ হচ্ছে জ্ঞানের পূর্ন পরাকাষ্ঠা অর্থাৎ উচ্চতর জ্ঞানের লাভের উপায় যা শূন্যতার প্রতিপাদক। প্রজ্ঞা পারমিতার বুৎপত্তি প্রর্দশন করতে গিয়ে ‘অষ্ঠ সহস্র প্রজ্ঞা পারমিতা ‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে সর্বধর্ম অনুপলদ্ধকে প্রজ্ঞা পারমিতা বলা হয়েছে। এর গুরুত্ব প্রতিপাদনে শত সাহস্রিকা প্রজ্ঞা পরিমিতাতে বলা হয়েছে চন্দ্র, সুর্য যেমন চতুদ্বীপ উদ্ভাসিত করে তদ্রুপ প্রজ্ঞা পরিমিতা ও অন্য পারমিতা সমূহকে পরিশোধিত করে।


উপজীব্যঃ
[১]উইকিপিডিয়া
[২]বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (উইকি সংকলন)
[৩]সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু
[৪]ধর্ম হ্যাভেন
[৫]ইমন জুবায়েরের বাংলা ব্লগ
[৬]ড. রমিত আজাদ

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *