অসামাজিক

অসামাজিক

এই গ্রহটা, এই শহরটা অনেক বেশী স্বার্থপর। এখানে প্রতি মূহুর্তে আপনাকে শুধু দেখাতে হবে, ‘শো অফ’ করতে হবে। আপনি যতক্ষন না হাঁকিয়ে বেড়াবেন, দেখিয়ে বেড়াবেন আপনার নীরব পরিশ্রমের মূল্য কেউ ততদিন দিবে না। আপনাকে প্রতি মূহুর্তে আশপাশের মানুষকে ধাক্কা দিয়ে বুঝাতে হবে আপনি তার জন্য অনেক পরিশ্রম করছেন। প্রতিটা নিঃশ্বাসে জানান দিতে হবে আপনি তার সকল দায়িত্ব মাথায় নিয়ে নিয়েছেন। বাস্তবিক পক্ষে নিয়েছেন কিনা সেটা এখানে মূখ্য বিষয় নয়। এখানে অন্তর্মূখীতার কোন স্থান নেই। আপনার অন্তর্মূখীতার ঋন আপনাকেই পরিশোধ করতে হবে- ক্ষয়ে-ক্ষয়ে, সয়ে-সয়ে।

অন্তর্মূখী মানুষগুলোকে কেন জানি এই সমাজ স্থান দিতে চায় না। তাদের গায়ে অসামাজিকের ট্যাগ লাগিয়ে সামাজিক মানুষগুলো তাদেরকে সমাজচ্যুত করতে পারলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে পারে। আপনাকে প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশ করতে হবে আপনার উচ্ছ্বাসগুলো, প্রকাশ করতে হবে অন্তর্লীন বেদনাগুলোও। তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে তাদের মন্তব্য, তাদের কথা, তাদের সংস্পর্শ আপনার জীবনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে। না করলেও ক্ষতি নেই। তবুও বোঝাতে হবে। তাদের হৃদয়কে জয় করতে হবে।

আপনি যদি বুঝাতে ব্যর্থ হন তবে সমাজ আপনাকে প্রচন্ড অহমিকা সম্পন্ন মানুষ ভাববে। ভাবাটাই স্বাভাবিক। আপনি যে নিজেকে প্রকান্ড এক দেয়ালের দ্বারা নিজেকে নির্বাসিত করে রেখেছেন। কারো দ্বায় পড়েনি সেই দেয়াল টপকে ভেতরের আপনাকে দেখার। আপনাকেই অভিনয় করতে হবে, হিপোক্রেট হতে হবে। আশেপাশের মানুষগুলোকে বুঝিতে দিতে হবে তাদের ছাড়া আপনার চলছেই না।

এখনও মাইন্ড ডিটেক্টর আবিষ্কৃত হয়নি। সুতরাং আপনার অভিনয় বোঝার ক্ষমতা কারো নেই। কেউ তো আর আপনার মুখের সামনে একটা ডিভাইস নিয়ে এসে পরীক্ষা করতে যাবে না যে নিয়মিতই তাকে প্রসংশার সাগরে ভাসিয়ে দিলেও মনের ভেতর ধারালো ছুরিতে রক্তাক্ত করার নীলনকশাটা সাজাচ্ছেন। হতে পারে রক্তটার কোন বাহ্যিক প্রবাহ থাকবে না, থাকবে মানসিক!

মানুষ সবসময় প্রিয়জনকে আকড়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু একা একা থাকতে থাকতে একটা সময় আসে যখন অন্যলোকের ছায়াও সহ্য হয় না। ভালোবাসার ক্ষমতাটাও দিনদিন নষ্ট হতে থাকে। দুনিয়ার সকল মানুষকে অসহ্য মনে হতে শুরু করে। এই অন্তর্মূখী মানুষগুলো বড্ড বোকা, অনেক বেশী অভিমানী। তারা ভালোবাসা চায় না, কামনা চায় না, খ্যাতি চায় না। শুধুমাত্র একটু এটেনশন চায়। তারা চায় না তাদের চারপাশের উঁচু প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে কেউ তাদের ভালোবাসুক। তারা চায় কেউ এক পড়ন্ত বিকেলে সব কাজ ফেলে গালে হাত দিয়ে একজন তার কথা শুনুক। জ্বরগ্রস্থ ঘুমহীন রাতে কপালে হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে দিবে – পৃথিবীটা একটা চমৎকার গ্রহ; এখানে মাঘের বিকেলে কুয়াশা জমা রেল লাইনে বসে গল্প শুনলেও শত বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু আপনার এই চাওয়া-পাওয়া, এই আবেগের কোন মূল্য নেই এখানে। তাই স্বার্থপর এই যান্ত্রিক শহরে জোনাক পোকা না পেয়ে সোডিয়াম লাইটের কৃত্রিম আলোতে আপনার স্বপ্নগুলো ফেরী করতে থাকুন অন্য মানুষদের কাছে। যেদিন স্বপ্ন ফেরী করা শেষ হয়ে যাবে সেদিনের পর হয়তো আপনাকেকেও আর খুঁজে পাওয়া যাবেনা পূর্বসূরীদের মতো। সেদিনগুলো আসে হুট করেই…

ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *